সাবেক বিমান কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির তুরাগ নদী থেকে লাশ উদ্ধার। অভিযান থেকে রহস্যজনক অবমুক্তি, রাজনৈতিক অভিযোগ ও মৃত্যুর নেপথ্যের গভীর ঘটনার বিশেষ রিপোর্ট।
রাজধানীর উত্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিমান বাহিনীর বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির লাশ। গত ২৭ অক্টোবর রাতে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তাঁর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াজাল ও নানা বিতর্ক। এটি কি কেবলই একটি দুর্ঘটনা নাকি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী চর্চা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ঘটনাটিকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। তবে পেছনের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন সামনে চলে আসে। ঘটনার গভীরতা বুঝতে হলে তাঁর সাম্প্রতিক অতীত ও বিতর্কিত ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিশেষ অভিযান ও ৮৪ থেকে ৮৩ জনে নেমে আসার অদ্ভুত গণিত
তুরাগ নদীতে লাশ পাওয়ার কয়েক দিন আগের একটি ঘটনা এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে। রাজধানীর একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে পুলিশের বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়। সেখান থেকে মূলত ৮৪ জনকে আটক করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়। বাদ পড়ে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তিটি ছিলেন এই সাবেক বিমান কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি। অথচ একই স্থান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তালিকার শীর্ষ নামগুলোর মধ্যে ছিলেন তাঁর নিজের বোন। যেখানে পরিবারের অন্য সদস্য গ্রেপ্তার হলেন, সেখানে তাহসিফকে কীভাবে ছেড়ে দেওয়া হলো? কিসের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনাকারী দল তাঁকে অবমুক্তি দিল? এই একটি সংখ্যার হিসাব পরিবর্তনের পেছনে কোন অদৃশ্য শক্তি কাজ করেছিল, তা নিয়ে তীব্র ধোঁয়াজাল রয়েছে।
গোপন ফোনালাপ ও সিসিটিভি ফুটেজের চাঞ্চল্যকর ক্লিপ
মাদক পার্টিতে পুলিশের অভিযানের সময়ের একটি ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
সিসিটিভি ও গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিওতে তাহসিফ সাউরিকে স্পষ্ট দেখা যায়।
অভিযানের এক পর্যায়ে তিনি মূল কক্ষ থেকে সরে গিয়ে দরজার আড়ালে যান। সেখানে গিয়ে তিনি অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে ফোনে কারো সাথে কথা বলেন।
কার সাথে তিনি সেদিন শেষ মুহূর্তে ফোনে কথা বলেছিলেন? অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিটি কে ছিলেন যিনি পুলিশকে নির্দেশ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নিলেন? সেই রাতের ফোনালাপের অডিও রেকর্ড এবং কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে সেই ফোন কলের বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও জটিল প্রশাসনিক সমীকরণ
পুলিশের বিশেষ অভিযানের নেপথ্যে ছিল সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন, ঐ দিনের অভিযানটি স্বাভাবিক কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মূলত প্রভাব বিস্তারের এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। সাউরি কি সেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সমীকরণ সম্পর্কে স্পষ্ট জানতেন? তিনি কি এমন কোনো স্পর্শকাতর তথ্য হাতে পেয়েছিলেন যা প্রকাশের ভয় ছিল? এমন প্রশ্ন ওঠার কারণ হলো, পুলিশি হেফাজত থেকে ছাড়া পাওয়ার পরপরই তিনি নিখোঁজ হন। ছাড়া পাওয়ার ঘটনার ঠিক দুদিনের মাথায় তাঁর লাশ নদীতে ভেসে ওঠে। কাকতালীয় হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এটি নিছক কাকতালীয় নয় বলে অনেকের ধারণা। এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
‘র’ এর এজেন্ট তকমা, বরখাস্ত ও আন্তর্জাতিক সংযোগের দাবি
তাহসিফ সাউরির বিরুদ্ধে ওঠা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিযোগের তালিকাও নেহাত ছোট নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাঁকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁকে বিমান বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ বাতিল করা হয় এবং তাঁকে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হয়।
বিশিষ্ট বার্তা সম্পাদক মাহমুদুর রহমানও তাঁর পত্রিকায় নেটওয়ার্ক ফাঁসের খবরের সাথে সাউরির নাম আনেন। একদিকে তাঁকে ভারতীয় এজেন্সির ঘনিষ্ঠ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বরখাস্ত ও জেল খাাটানো হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত করে তিনি ভিন্ন মেরুর সাথেও যোগাযোগ রাখছিলেন। এই দ্বিমুখী পরিচয় এবং এজেন্সিগুলোর জটিল খেলাই কি তাঁর কাল হলো?

‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্ব এবং আইএসআই চক্রান্তের ছায়া
বিশ্বজুড়ে গোপন রাজনৈতিক খেলায় ‘ডিপ স্টেট’ অত্যন্ত সক্রিয়। তারা নিজেদের স্বার্থে যেকোনো সীমা পর্যন্ত যেতে পারে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারকে ঘিরে বড় ধরনের নকশা ছিল। সেই নকশার ভেতরের খবর যারা জানতেন, তারা সবাই ঝুঁকিতে।
গোপন তথ্য ফাঁসের ভয়ে হয়তো তাদের পথ থেকে সরানো হচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ষড়যন্ত্রের সহযোগীদের পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।
এই ঘটনার পিছনে পাকিস্থানের কুখ্যাত জঙ্গি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ভু-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের মর্মান্তিক পরিণতি স্মরণীয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের ঘাতকদের পরিণতিও কেউ ভুলেনি। চক্রান্তে হাত মেলানোর শেষ পরিণতি সবসময়ই অত্যন্ত ভয়াবহ হয়।
তাহসিফের মৃত্যু সেই পুরনো চক্রান্তের নতুন এক অধ্যায় হতে পারে। সত্য বের করতে নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও সামাজিক মাধ্যমের গুজব যুদ্ধ
সাউরির মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানামুখী বিভ্রান্তিকর প্রচার শুরু হয়েছে। বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রচার করছে যে, প্রতিপক্ষ দলীয় ক্যাডাররা তাঁকে মেরে ফেলেছে। আবার অন্য একটি পক্ষ দাবি করছে, গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসের ভয়েই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র এবং নথিপত্র অন্য কথা বলছে। যদি সাউরি নির্দিষ্ট কোনো দলের অনুসারী হতেন, তবে বর্তমান সরকারের সময়ে তিনি কারাবরণ করতেন না। কোনো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা নিজেদের ব্যবহৃত আ্যাসেটকে সরাসরি এভাবে হত্যা করে না।
এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে মূল ঘটনা থেকে মানুষের নজর সরানোর চেষ্টা চলছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্রকৃত সত্য ও অপরাধীদের পরিচয়।
পরিবার ও ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার করুণ ট্র্যাজেডি
তাহসিফের পরিবারের ভেতরের চিত্র অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক। তাঁর বোন বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে জেলহাজতে দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে তাঁদের পিতা মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী।
পরিবারের উপার্জনক্ষম ও প্রভাবশালী সদস্যের এভাবে রহস্যজনক মৃত্যুতে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে।
পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানে বোন গ্রেপ্তার হওয়া এবং পরবর্তীতে ভাইয়ের নদী থেকে লাশ উদ্ধার করা—পুরো পরিবারকে এক গভীর অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। স্বজনরা দাবি করছেন, তাহসিফ কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তাঁকে ষড়যন্ত্র করে জটিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গোলমেলে ফাঁসানো হয়েছে।
পরিবারের ওপর দিয়ে যাওয়া এই ঝড় সাধারণ মানুষের মনে গভীর সহানুভূতির সৃষ্টি করেছে।
অপরাধের রহস্য উদঘাটন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় উত্তরখান থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে সাধারণ অপমৃত্যু হিসেবে এটি ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি একটি হাই-প্রোফাইল রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনা।
এর সাথে পুলিশের ভেতরের দ্বন্দ্ব, সাবেক সেনা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক এজেন্সির সংযোগ জড়িত।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ও সিআইডিকে অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে এর তদন্ত করতে হবে। অভিযান থেকে কীভাবে একজন আসামি বাদ পড়লেন, সেটির উত্তর দিতে হবে। ৮৪ জন থেকে ৮৩ জনে নেমে আসার হিসাবনিকাশ মিললেই বের হয়ে আসবে মূল অপরাধী।
একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রকৃত সত্য জনসমক্ষে আনা এখন সময়ের দাবি।
