ভারত-চীন সংঘাত উসকে দেওয়ার আন্তর্জাতিক নকশা ও এশিয়ার স্বায়ত্তশাসন। আরআইসি, ব্রিকস এবং পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে বিশেষ রিপোর্ট।
ভারত-চীন সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও তথ্য যুদ্ধ
দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দিন দিন জটিল হচ্ছে। ভারত ও চীনের মধ্যে বিরাজমান সুসম্পর্ক নষ্ট করার নানা চক্রান্ত স্পষ্ট। একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক চক্র বেইজিংয়ের কাছে সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য পাঠাচ্ছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের দূরত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া। ইতিপূর্বে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে চীন কেন্দ্রিক নতুন এই ছক সাজানো হয়। বেইজিংকে বোঝানো হচ্ছে যে ভারতের প্রতিরক্ষা নীতি তাদের স্বার্থবিরোধী। এর ফলে দুই এশীয় পরাশক্তির মধ্যে বাড়ছে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দেয়াল। কৌশলগত এই দ্বন্দ্বে সরাসরি লাভবান হচ্ছে তৃতীয় কোনো পরাশক্তি। দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি ভারসাম্য নষ্ট করাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
সীমান্ত বিরোধে রাশিয়ার পিছু হটা ও খনিজ তেলের আন্তর্জাতিক অংক
অতীতে ভারত-চীন সীমান্ত সমস্যা সমাধানে মস্কোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া সর্বদা দুই প্রতিবেশী মিত্রের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে মধ্যস্থতা করত। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্রেমলিনের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই পরিবর্তিত। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সম্প্রতি অপরিশোধিত খনিজ তেল সংক্রান্ত বিশাল চুক্তি হয়েছে। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে মস্কো এখন কিছুটা নমনীয়। এই ক্রুড অয়েল চুক্তির চাপে সীমান্ত ইস্যুতে মধ্যস্থতা থেকে সরছে রাশিয়া। ফলে ভারত ও চীনের মধ্যকার ঐতিহাসিকভাবে সংকটময় সীমান্ত ইস্যুগুলো আরও জটিল হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারী না থাকায় দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনার সম্ভাবনা বাড়ছে। শক্তির এই খেলায় এশীয় অঞ্চলের ভারসাম্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
ট্রিপল-অক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী সামরিক নীতির রহস্য
আন্তর্জাতিক রাজনীতির টেবিলে এক অভিনব এবং চতুর কৌশল বাস্তবায়ন হচ্ছে। খলিল, তারেক এবং জেনারেল আসিম মুনীরের সমন্বয়ে বিশেষ নকশা সাজানো হয়েছে। এই দলটি মার্কিন প্রশাসনের কাছে যৌথ একটি কৌশলগত খসড়া উপস্থাপন করেছে। এই খসড়ার মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী সামরিক সুবিধা বজায় রাখা। একদিকে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের বহুবছরের সামরিক যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ থাকবে। অন্যদিকে ভারতের সাথে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বাণিজ্যের দরজা খোলা রাখা যাবে। ওয়াশিংটনকে কোনো একক মিত্র বেছে নেওয়ার সংকটে পড়তে হচ্ছে না।
তারা একই সাথে নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক রাখছে।
এই কৌশলী প্রস্তাবের ফলে অঞ্চলে নয়াদিল্লির একচ্ছত্র প্রভাব ও ক্ষমতা বেশ খর্ব হচ্ছে।
শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফর এবং আরআইসি-ব্রিকসের প্রয়োজনীয়তা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের শীর্ষ বৈঠকের সময় এক লক্ষণীয় কূটনৈতিক পরিবর্তন দেখা যায়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিউইয়র্কের বৈঠক এড়িয়ে সরাসরি ওয়াশিংটনে যান। বেইজিং ও ওয়াশিংটনের বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর প্রভাব ধরে রাখার চতুর সমীকরণ স্পষ্ট। বেইজিং নিশ্চিত করতে চাইছে যেন তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের করিডোরগুলো ঝুঁকিতে না পড়ে। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়ার প্রভাব ধরে রাখতে আরআইসি জোট অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রাশিয়া, ভারত ও চীনের যৌথ ফোরাম ছাড়া আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা অসম্ভব। একই সাথে ব্রিকস জোটের শক্তি বৃদ্ধিতে ভারতের জোরালো নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। যদি ভারত পশ্চিমা অক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝোঁকে, তবে আন্তর্জাতিকভাবে একা হয়ে পড়বে। আঞ্চলিক মিত্রদের পাশে নিয়েই ভারতকে নিজের সার্বভৌম স্থান নিশ্চিত করতে হবে।
মিয়ানমারে মার্কিন কর্মকর্তাদের গোপন সফর এবং চীনের নীরব অনুমতি
গত মাসে দুইজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা গোপনে মিয়ানমার সফর সম্পন্ন করেছেন। চীনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সায় ছাড়া এটি ঘটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নীতি ও অর্থনীতিতে চীনের কর্তৃত্ব অপরিসীম। চীন নিজের স্বার্থেই মার্কিন প্রতিনিধিদের এই সফরকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন মিয়ানমারে নিজস্ব একটি স্বাধীন ও শক্ত অবস্থান গড়তে চাইছে।
নয়াদিল্লির আঞ্চলিক নজরদারি ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা পাশ কাটিয়ে এই কাজ চলছে।
এর আগে বাংলাদেশের সাথেও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সুকৌশলে দূরত্ব তৈরি করেছে।
দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা, শান্তি ও বাণিজ্য চুক্তিগুলো দুর্বল করে বহিরাগত বলয় তৈরি হচ্ছে।
পুরো বঙ্গোপসাগরীয় এলাকাকে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর সামরিক দাবার ঘর বানানো হচ্ছে।
ডিপ স্টেটের বৈশ্বিক আধিপত্য এবং এনএসআই কর্মকর্তার চীন সফর
আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের দৌড়ে আমেরিকান ‘ডিপ স্টেট’ বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে। জর্জ সোরোস এবং অ্যালেক্স সোরোসের বৈশ্বিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে নানা পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন এনএসআই কর্মকর্তা চীনের বেইজিং সফর করেছেন। এই সফরকে আন্তর্জাতিক সংঘাত উসকে দেওয়ার ছক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারত ও চীনের বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলাই এই মিশনগুলোর মূল কাজ।
দেশীয় কিছু এজেন্সির সদস্য আন্তর্জাতিক পরাশক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন।
এতে এশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ছে। নিজেদের জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই প্রবণতা ভয়াবহ।
বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী অঞ্চলগুলো এখন এক অদৃশ্য সামরিক স্নায়ুযুদ্ধের ভুক্তভোগী।
আরব বসন্তের ভয়াবহতা এবং এশীয় স্বায়ত্তশাসন হারানোর হুমকি
যদি পরাশক্তিগুলোর এই বৈরী কৌশল থামানো না যায়, তবে চরম বিপর্যয় আসবে। বহু বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের বাহানায় ‘আরব বসন্ত’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার মাশুল হিসেবে আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একই অস্থিতিশীলতার বীজ এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রোপণ করা হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদের জন্য এই অঞ্চলের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন সম্পূর্ণ হারিয়ে যেতে পারে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আঞ্চলিক শান্তি চিরতরে বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাইরের শক্তিগুলো কখনোই এই অঞ্চলের স্থায়ী কল্যাণ বা উন্নয়ন চায় না।
নিজস্ব ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর ঐক্য জরুরি।
অন্যথায় আগামী দিনে এশিয়ার ভবিষ্যৎ দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতা ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।

অধ্যাপক ড. আরিফ খান
সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
