যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের প্রভাব ভারত ও পাকিস্তানের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং কূটনীতিতে কীভাবে পড়বে ?
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নতুন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই ক্ষমতার পালাবদলের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের ওপর। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি বদলে যেতে পারে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং ভারতের বাণিজ্য সম্ভাবনা
কংগ্রেসে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সচেষ্ট হবেন। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে একটি লাভজনক ও চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পেতে পারে। নয়াদিল্লিও এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে নিজেদের অনুকূলে বাণিজ্য শর্ত আদায় করতে চাই দীর্ঘদিনের আলোচনা ফলপ্রসূ করার চেষ্টা চালাবে। চীন ও ভিয়েতনামের মতো বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের তুলনায় ভালো শুল্ক সুবিধা পেতে ভারত এবার কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের ৩০১ ধারার তদন্তের মুখে থাকা ভারতীয় অর্থনীতি এবার কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে।
এইচ-১বি ভিসা নীতিতে পরিবর্তনের আশা
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও ভিসা সংক্রান্ত নীতিমালায় কংগ্রেসের এই পরিবর্তনের একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য নির্ধারিত এইচ-১বি ভিসা প্রক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের অতি কড়াকড়ি বেশ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে এক লাখ ডলারের মোটা ফি এবং কঠোর ছাঁটাই নীতি ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। মার্কিন প্রযুক্তি খাতের বড় একটি অংশ ভারতীয় পেশাজীবীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। এখন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এই বৈষম্যমূলক ও কঠোর নীতিগুলো নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার ইস্যু ও দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় জটিলতা
ভারতের জন্য সবকিছু পুরোপুরি ইতিবাচক হবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। মার্কিন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধিকার এবং স্বাধীনতা সুরক্ষা নিয়ে তাঁদের কঠোর অবস্থান দীর্ঘদিনের। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা যদি এই বিষয়গুলোতে বাড়তি চাপ প্রয়োগ করেন, তবে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি হতে পারে। ফলে বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি নয়াদিল্লিকে কূটনৈতিক মোর্চায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ সম্পর্কের হিসাব-নিকোট
ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পুরো দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ নিতে পারে। বিগত দেড় বছর ধরে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ মহলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলতে নিরলস চেষ্টা চালিয়েছে ইসলামাবাদ। ট্রাম্প পরিবারের বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ভেঞ্চারে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বেশ জোরালো ছিল। বিশেষ করে মার্কিন বিশেষ দূতের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং ড্রোন প্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের শীর্ষ মহলের বিশেষ সখ্যও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
কংগ্রেসের তদন্তের মুখে পড়তে পারে ইসলামাবাদের চুক্তিগুলো
মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় এই বিষয়গুলো কঠোর তদন্তের মুখোমুখি হতে পারে।
ট্রাম্প পরিবারের বাণিজ্যিক লেনদেন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসার স্বচ্ছতা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই সরব ছিলেন।
বিশেষ করে জ্যারেড কুশনার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে হওয়া বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক এখন বাড়তি নজরদারির আওতায় আসবে।
এর ফলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং দেশটির সরকারের সঙ্গে মার্কিন প্রভাবশালী মহলের করা গোপন বা প্রকাশ্য চুক্তিগুলো বিতর্কের মুখে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যের নতুন মারপ্যাঁচ
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার এই নাটকীয় পরিবর্তন প্রকারান্তরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে।
এক দশক ধরে চলা কূটনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের বাঁকবদল আসার সম্ভাবনা এখন প্রবল হয়ে উঠেছে।
নয়াদিল্লি যেমন বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করার সুবর্ণ সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি ইসলামাবাদকে পড়তে হচ্ছে বহুমুখী চাপের মুখে।
আগামী দিনে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই সমীকরণগুলোকে আরও কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
