মার্কিন কর্মকর্তাদের মিয়ানমার সফর, চীন-ভারত অক্ষ ও দক্ষিণ এশিয়ার সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী রিপোর্ট। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও নতুন সমীকরণের বিশ্লেষণ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে। গত মাসে দুজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা মিয়ানমার সফর করেছেন। এই সফর কূটনৈতিক পাড়ায় বড় ধরনের গুঞ্জন তৈরি করেছে। মিয়ানমারে চীনের সুগভীর প্রভাব সর্বজনবিদিত। তাই বেজিংয়ের সায় ছাড়া এই সফর মোটেও সম্ভব ছিল না। চীন এই অঞ্চলে নিজের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ নিয়ে বেশ সচেতন। মার্কিন প্রতিনিধি দলের এই কূটনৈতিক উপস্থিতি বেশ অর্থবহ। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে নিজের একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরিতে ব্যস্ত। ওয়াশিংটন সেখানে নতুন এক শক্ত ঘাটি গড়ার চেষ্টা করছে। এই পদক্ষেপটি আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বেইজিং কেন এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা মেনে নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে এর পেছনে বড় কূটনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে।
ভারতের চোখ এড়িয়ে বাংলাদেশে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক ঘুঁটি
দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির কৌশলগত নজরদারি এড়ানো অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু ওয়াশিংটন এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের অগোচরে বাংলাদেশে মার্কিন বলয় তৈরির চেষ্টা চলছে। নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক প্রভাবকে সাময়িকভাবে পাশ কাটানোর এই কৌশল বেশ অভিনব। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে একলা চলার নীতি গ্রহণ করছে। তারা বাংলাদেশকেও নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে আগ্রহী। এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ঢাকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ওয়াশিংটন এখানে নিজস্ব রাজনৈতিক অক্ষ তৈরি করতে কাজ করে যাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক কৌশলগত ব্যস্ততার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ঐতিহ্যগত মিত্রদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা এশীয় নিরাপত্তা মানচিত্র বদলে দিচ্ছে।
ওআইসি সম্মেলন, জাপানে কূটনৈতিক সফর ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি
আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে সম্প্রতি একের পর এক ঘুঁটি সাজানো হচ্ছে।
ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসির গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে।
এর পরপরই গুরুত্বপূর্ণ এক কূটনৈতিক সফরে টোকিও যাচ্ছেন প্রতিনিধি খলিল। এর আগে ইসরায়েল ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলে নানা বাদানুবাদ ঘটে। তেল আবিবের নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং তুরস্কের সাথে জোটবদ্ধ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় নয়াদিল্লিকে কিছুটা কোণঠাসা করা। মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীলতার প্রভাব আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। কূটনৈতিক টেবিলে প্রভাব বাড়াতে নতুন অক্ষ তৈরির চেষ্টা চলছে। জাপান সফরটি রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বৈশ্বিক ফিয়াট অর্থব্যবস্থা ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এক বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সনাতন ফিয়াট মুদ্রা ব্যবস্থা তার পুরোনো কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ডলার কেন্দ্রিক বৈশ্বিক ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা কমছে। নতুন ডিজিটাল মুদ্রা ও স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রবণতা বাড়ছে। এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কেন্দ্রেও ধস নামছে। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পথ বন্ধ হলে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা দ্রুত কমছে।
ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর তাদের কোনো একক প্রভাব থাকবে না।
ফিয়াট ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই বিলীন হবে।
ফলে পরাশক্তিগুলোর সামরিক কৌশলেও পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার গোয়েন্দা কূটনীতি ও বেইজিংয়ের সাথে নয়া যোগাযোগ
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক এই টানাটানির মধ্যে বাংলাদেশ চুপ করে বসে নেই। দেশের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা বেইজিং সফর করেছেন। এই গোপনীয় ও কৌশলগত চীন সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের একমুখী প্রভাব ঠেকাতে এটি ঢাকার একটি কৌশলী পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে। বেইজিং সর্বদা ঢাকার সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।
গোয়েন্দা পর্যায়ে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নিরাপত্তা সহযোগিতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে।
ঢাকা কোনো একক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে চাইছে না।
নিজেদের সুরক্ষার জন্য বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা সময়ের প্রয়োজন।
এই চীন সফর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণকে নতুন একটি রূপ দিচ্ছে। ঢাকার এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিতভাবেই পরাশক্তিগুলোকে ভাবিয়ে তুলছে।
জাপানি অর্থায়ন, রাজনৈতিক বলয় ও ভারতের সম্ভাব্য একঘরে হওয়া
এশীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হওয়ায় অর্থায়নের উৎসও বদলাচ্ছে।
গুঞ্জন রয়েছে যে টোকিও অঞ্চলের বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করতে পারে।
তারেক রহমানকে ঘিরে নতুন এক রাজনৈতিক অক্ষ তৈরির সম্ভাবনা আলোচনায় রয়েছে।
একই সাথে নয়াদিল্লি যদি আমেরিকান কৌশলের তোড়ে অন্ধভাবে হেঁটে যায়, তবে বিপদ। ওয়াশিংটনের তৈরি ফাঁদে পা দিলে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। চারপাশের মিত্রদের হারিয়ে নয়াদিল্লি আঞ্চলিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে থাকলে ভারতের ক্ষতি বেশি। টোকিওর এই রাজনৈতিক অর্থায়ন দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতা কাঠামো বদলে দিতে পারে। পুরো অঞ্চলের ওপর টোকিও ও ওয়াশিংটনের সম্মিলিত প্রভাব নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
আরব বসন্তের ছায়া: অস্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব হারানোর হুমকি
দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। পরাশক্তিগুলোর এই রক্তক্ষয়ী খেলায় ছোট দেশগুলোর স্বাধীনতা মারাত্মক হুমকির মুখে। মধ্যপ্রাচ্যে একসময় কথিত গণতন্ত্রের নামে ‘আরব বসন্ত’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার করুণ পরিণতি হিসেবে পুরো অঞ্চল বছরের পর বছর অস্থিতিশীলতায় ডুবেছে। একই ধরনের অস্থিতিশীলতার নীলনকশা এখন দক্ষিণ এশিয়ায় বাস্তবায়িত হওয়ার পথে। যদি এশিয়ার দেশগুলো এই কৌশলগত চক্রান্ত রুখতে না পারে, তবে মহা বিপদ।
পুরো অঞ্চলের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বায়ত্তশাসন দীর্ঘ মেয়াদের জন্য হারিয়ে যাবে।
বাহ্যিক হস্তক্ষেপের কারণে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শূন্যে গিয়ে ঠেকবে।
ভৌগোলিক নিরাপত্তার স্বার্থে আঞ্চলিক দেশগুলোর সমন্বিত প্রতিরোধ এখন অত্যন্ত জরুরি।
আমেরিকার দৃষ্টিতে চীন বনাম ২০৫০ সালে ভারতের পরাশক্তি উত্থান
ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী বিশ্ব কৌশল পর্যালোচনা করলে এক অদ্ভুত সত্য উঠে আসে।
আমেরিকা বিশ্বাস করে না যে চীন কোনোদিন তাদের সত্যিকারের বিকল্প হবে। কারণ বেইজিংয়ের মুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা বা পশ্চিমের মতো শেয়ার বাজার নেই। চীনের রাজনৈতিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর অভাবকে ওয়াশিংটন দুর্বলতা মনে করে। তবে ওয়াশিংটনের মূল ভয় ও মাথাব্যথার কারণ আসলে অন্য একটি দেশ। ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। ২০৫০ সালের মধ্যে নয়াদিল্লিই হবে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আসল বিকল্প।
তাই ওয়াশিংটন চায় না ভারত কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাক।
নয়াদিল্লিকে দুর্বল ও কৌশলে নিয়ন্ত্রণে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সতর্কতা ও স্বনির্ভর ভবিষ্যতের তাগিদ
বর্তমান সময়ের জটিল বিশ্ব পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে সতর্ক হতে হবে। কোনো পরাশক্তির অন্ধ অনুসারী হওয়া জাতির জন্য চরম বিপজ্জনক হতে পারে। নিজস্ব ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঢাকা, নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যকার সমন্বয় আঞ্চলিক স্থায়িত্ব রক্ষা করতে পারে। বাহ্যিক শক্তিগুলো সর্বদা নিজেদের ফায়দা হাসিল করতে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তৈরি করে।
অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের মাধ্যমে এই চক্রান্ত ব্যর্থ করা সম্ভব।
দক্ষিণ এশিয়ার সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশল গড়ে তুলতে হবে।
অন্যথায় এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।
সময় থাকতে সচেতন না হলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না।

অধ্যাপক ড. আরিফ খান
সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
