ঢাকায় ভ্যানচালক ও ফুচকা বিক্রেতার জীবনসংগ্রাম। কম আয়, বাড়তি খরচে ঘরভাড়া বাকি, ঋণের বোঝায় নিত্যদিনের লড়াই।
রাজধানী ঢাকা-র ব্যস্ত নগরজীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো নিম্নআয়ের মানুষের কঠিন বাস্তবতা। কেউ ঘরভাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেউ আবার ঋণের বোঝা টানতে টানতে ক্লান্ত। ভ্যানচালক ইউসুফ ও ফুচকা বিক্রেতা শাহীন—দুজনের গল্পই যেন একই সুরে বাঁধা সংগ্রামের কাহিনি।
কাজ নেই, আয় নেই—অস্থির ইউসুফ
ঢাকার উদ্যান এলাকায় ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ইউসুফ। সিমেন্ট, রড কিংবা বাসাবাড়ির মালামাল বহন করাই তাঁর পেশা। কিন্তু আগের মতো কাজ আর পান না।
“আগে খ্যাপ পাইতাম, এখন মানুষ কম নেয়,”—আক্ষেপ করে বলেন তিনি।
বর্তমানে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়, যার মধ্যে ১০০ টাকা ভ্যানের মালিককে দিতে হয়। মাস শেষে হাতে তেমন কিছুই থাকে না।
ঘরভাড়া বাকি, অনিশ্চিত জীবন
গাবতলীতে একটি ছোট ঘরে স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকেন ইউসুফ। মাসিক ভাড়া তিন হাজার টাকা। কিন্তু চলতি মাসের ভাড়া এখনো পরিশোধ করতে পারেননি।
বাড়িওয়ালার চাপ বাড়ছে, কিন্তু তাঁর হাতে টাকা নেই। “কই যামু?”—এই প্রশ্নই যেন তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি।
১৯৮৬ সালে নদীভাঙনে ভোলার বাড়ি হারিয়ে ঢাকায় আসেন ইউসুফ। সেই থেকে টিকে থাকার লড়াই চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
প্রযুক্তির প্রভাব: কমেছে কাজ
ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যান ও ছোট পিকআপের আধিক্যে প্যাডেলচালিত ভ্যানের চাহিদা কমে গেছে। ফলে ইউসুফের মতো অনেক শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারাচ্ছেন।
এই পরিবর্তন নগর অর্থনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে পুরোনো পেশাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছে নতুন প্রজন্ম
ইউসুফ তাঁর ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এখন ছেলেকে একটি গাড়ি মেরামতের দোকানে কাজ শিখতে দিয়েছেন।
অভাবের কারণে শিক্ষার সুযোগ হারানো—এটি শহরের নিম্নআয়ের পরিবারের একটি সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে।
ফুচকা বিক্রেতা শাহীন: আয় আছে, সঞ্চয় নেই

অন্যদিকে, আদাবর এলাকায় ফুটপাতে ফুচকা বিক্রি করেন শাহীন। দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় হলেও মাস শেষে কিছুই জমাতে পারেন না।
স্কুল খোলা থাকলে বিক্রি ভালো হয়, কিন্তু ছুটির দিনে আয় কমে যায়। ফলে তাঁর আয় অনিশ্চিত।
ঋণের বোঝা ও পরিবারের দূরত্ব
ছয় মাস আগে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন শাহীন। এখন প্রতি মাসে সেই ঋণ শোধ করতে হচ্ছে।
তিনি ঢাকায় একা থাকেন, আর তাঁর পরিবার গ্রামে। “ঢাকায় ঘর নিয়ে পরিবার রাখব কীভাবে?”—এই প্রশ্ন তাঁর কণ্ঠে অসহায়তা প্রকাশ করে।
স্বপ্ন আছে, পুঁজি নেই
শাহীন একটি ছোট দোকান দিতে চান, যাতে স্থায়ীভাবে ব্যবসা করতে পারেন।
কিন্তু প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকায় সেই স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
নগর জীবনের কঠিন বাস্তবতা
ইউসুফ ও শাহীনের গল্প আলাদা হলেও বাস্তবতা একই—কম আয়, বাড়তি খরচ, ঋণের চাপ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই শ্রেণির মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
ঢাকার নিম্নআয়ের মানুষের জীবন সংগ্রাম প্রতিদিনই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ঘরভাড়া, ঋণ, চিকিৎসা ও জীবিকার চাপে তাদের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন।
