নোয়াখালীর সুবর্ণচরে জামায়াত নেতা ডাক্তার সামাদের বাড়ি থেকে ৯৬ বস্তা ওএমএসের সরকারি চাল উদ্ধার করেছে প্রশাসন। ঘটনার বিস্তারিত ও দুই পক্ষের বক্তব্য জানুন।
বিশেষ প্রতিবেদন, সুবর্ণচর (নোয়াখালী): নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় এক পল্লী চিকিৎসকের বসতবাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রাণের চাল জব্দ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় জামায়াত ইসলামীর রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত বলে নিশ্চিত করেছে এলাকাবাসী ও প্রশাসন। শনিবার (১৬ মে) দুপুরের পর উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের অন্তর্গত ইমানআলী বাজার সংলগ্ন এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর অভিযানটি পরিচালিত হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই যৌথ অভিযানে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। উদ্ধারকৃত চালের বস্তাগুলো বর্তমানে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নেওয়া হলেও ঘটনার পর থেকেই মূল অভিযুক্ত এলাকা ছেড়ে পলাতক রয়েছেন। এদিকে ঘটনার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র কাদা-ছোড়াছুড়ি। একপক্ষ একে ওএমএস ও সরকারি চালের কালোবাজারি বললেও, অন্য পক্ষ এটিকে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় কেনা চাল এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছে।
যেভাবে প্রকাশ্যে এলো বিপুল পরিমাণ চালের মজুদ
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে,
চরজব্বার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং পেশায় পল্লী চিকিৎসক মো. আবদুস সামাদ ওরফে ডাক্তার সামাদের বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরেই সন্দেহজনক আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।
ইমানআলী বাজার এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল যে,
সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের চাল সাধারণ মানুষের হাতে না পৌঁছে একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে এই বাড়িতে এসে জমা হচ্ছে।
শনিবার সকালে কয়েকটি সন্দেহভাজন যান থেকে বস্তা নামিয়ে ডাক্তার সামাদের ঘরের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে সারিবদ্ধভাবে মজুদের বিষয়টি প্রতিবেশীদের নজরে আসে।
সরকারি লোগোযুক্ত বস্তা দেখে স্থানীয় যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষ সেখানে জড়ো হতে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বাড়ির মালিক কৌশলে সটকে পড়েন।
এরপর উপস্থিত জনতা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করে।
খবর পেয়ে বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান ও চাল জব্দ
অভিযান প্রত্যক্ষ করা স্থানীয় ইউপি মেম্বার জানান,
প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা ঘরে তল্লাশি চালিয়ে একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে সরকারি খাদ্য অধিদপ্তরের সিলমোহরযুক্ত মোট ৯৬টি চালের বস্তা উদ্ধার করেন।
প্রতিটি বস্তায় ৩০ থেকে ৫০ কেজি করে চাল ছিল বলে জানা গেছে।
উদ্ধার অভিযানের পর সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওসমান গণমাধ্যমকে জানান:
“আমরা স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে চরজব্বার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অভিযান পরিচালনা করি। সেখান থেকে সরকারি সিলযুক্ত ৯৬ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছে। যেহেতু অভিযানের সময় ঘরের মালিক বা মূল অভিযুক্তকে পাওয়া যায়নি, তাই চালের বস্তাগুলো জব্দ করে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে চালের উৎস সম্পর্কে বাড়ির সদস্যরা কোনো সন্তোষজনক জবাব বা তাৎক্ষণিক বৈধ প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
পারিবারিক দাবি: “রামগতির মাদ্রাসা থেকে কেনা চাল”
অভিযান চলাকালীন এবং পরবর্তীতে ডাক্তার সামাদের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, এই চালগুলো কোনো চুরির মাল বা অবৈধভাবে মজুদ করা সরকারি ত্রাণের চাল নয়।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী,
পার্শ্ববর্তী জেলা লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার তিনটি ভিন্ন কওমি ও নুরানি মাদ্রাসা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন অনুদান বা লিল্লা ফান্ডের অংশ হিসেবে এই চালগুলো বরাদ্দ পেয়েছিল।
পরবর্তীতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব খরচ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য সেই চালগুলো বাজারে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ডাক্তার সামাদের পরিবার সেই মাদ্রাসাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নগদ মূল্যে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চালগুলো কিনে সুবর্ণচরে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন।
তবে ক্রয়ের সপক্ষে কোনো রসিদ বা সরকারি অনুমোদনপত্র তারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের সামনে উপস্থাপন করতে পারেননি।
প্রশাসনের আলটিমেটাম ও আইনি ব্যবস্থা
শনিবার রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঘটনার বিষয়ে কোনো নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ইউএনও আকিব ওসমান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত পরিবার দাবি করেছে চালগুলো পার্শ্ববর্তী জেলার মাদ্রাসা থেকে কেনা।
আমরা তাদের সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সময় দিয়েছিলাম বৈধ কাগজপত্র ও ক্রয়ের রসিদ প্রদর্শনের জন্য।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা কোনো বৈধ ডকুমেন্টেশন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রশাসন সুনির্দিষ্ট নিয়মের বাইরে কাউকে ছাড় দেবে না।
যদি তারা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিজ বা ক্রয়ের শতভাগ বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারেন,
তবে সরকারি চাল কালোবাজারি ও অবৈধ মজুদের দায়ে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও ‘ষড়যন্ত্র’ দাবি
এদিকে ঘটনার জানাজানি হওয়ার পর নোয়াখালী জেলা ও সুবর্ণচর উপজেলা রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ডাক্তার সামাদ ওই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের আমির বা সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন বলে স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করার পর,
দলটির পক্ষ থেকে দ্রুত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
শনিবার বিকেলের পর সুবর্ণচর উপজেলা ও চরজব্বার ইউনিয়ন জামায়াতের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি লিখিত ‘প্রতিবাদ লিপি’ স্থানীয় সংবাদকর্মীদের কাছে পাঠানো হয়।
১ নম্বর চরজব্বার ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি মুজাহিদুল আহমেদ এবং অভিযুক্ত ওয়ার্ড সভাপতি ডাক্তার আব্দুস সামাদের যৌথ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে
“উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিক অপপ্রচার” বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতির মূল বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
বৈধ ডিলারশিপের দাবি: বিবৃতিতে বলা হয়, ডাক্তার আব্দুস সামাদের ছোট ভাই কামাল একজন লাইসেন্সধারী ও বৈধ চাল ব্যবসায়ী (ডিলার)।
তিনি সম্পূর্ণ সরকারি নিয়মকানুন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
মাদ্রাসার তালিকা: যে তিনটি মাদ্রাসা থেকে চাল কেনা হয়েছে, সেগুলোর নামও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
মাদ্রাসাগুলো হলো: ১. শিক্ষা গ্রাম দারুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা২. আশরাফুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা৩. ইখলাস নুরানী কওমী মাদ্রাসা
কুচক্রী মহলের চালবাজি: জামায়াত নেতাদের দাবি, একটি কুচক্রী মহল আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।
সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে কেনা চালকে ‘ত্রাণের চাল চুরি’ বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন পোর্টালে বানোয়াট সংবাদ ছড়ানো হচ্ছে,
যা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
ওএমএস ও সরকারি চালের বাজার মনিটরিংয়ে ঘাটতি?
সুবর্ণচরের এই ঘটনাটি স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে নতুন করে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সরকারি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বা কওমি মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দকৃত চাল কীভাবে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে ব্যক্তিবিশেষের শয়নকক্ষে মজুদ হয়,
তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতে, ওএমএস (OMS) কিংবা ভিজিএফ (VGF) এর চাল সাধারণত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেওয়া হয়।
যদি মাদ্রাসাগুলো এই চাল বিক্রিও করে থাকে, তবে তার জন্য জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
গ্রামীণ পর্যায়ে সরকারি চালের কালোবাজারি রুখতে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সুবর্ণচরের সাধারণ নাগরিকরা।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
চরজব্বার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, “প্রশাসনের নির্দেশে চালগুলো বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের গোডাউনে সিলগালা করে রাখা হয়েছে।
পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়েছে ইমানআলী বাজার এলাকায়।
প্রশাসনের পরবর্তী নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে চালগুলো সঠিক বিলিবণ্টন বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, মূল অভিযুক্ত ডাক্তার সামাদ বর্তমানে পলাতক থাকায় তার বক্তব্য সরাসরি নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে তার ভাই কামাল কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য যদি বৈধ কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হন, তবে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে চোরাচালান বিরোধী আইনে মামলা রুজু করবে।
সুবর্ণচরের শান্ত পরিস্থিতি বজায় রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
