তারেক রহমানের চীন সফর ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির গভীর সমীকরণ নিয়ে ড. আরিফ খানের এক্সক্লুসিভ ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। জানুন ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।
প্রফেসর ড. আরিফ খান: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি বদ্বীপ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর চালের প্রধান গুটি বা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) আমন্ত্রণে ডালিয়ান ও বেইজিংয়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান তথা অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্দরমহলে এক চাঞ্চল্যকর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি অর্থনৈতিক ফোরামের দ্বিপাক্ষিক সফর মনে হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল ভূ-কৌশলগত ট্রুস বা মহাজাগতিক চুক্তি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী নকশা।
বহুমেরু বনাম দ্বিমেরু বিশ্ব: বৈশ্বিক সমীকরণ
দীর্ঘদিন ধরে বেইজিং একটি ‘বহুমেরু’ (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থার ওকালতি করে আসছে, যেখানে ভারত, রাশিয়া, চীন এবং আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষমতার বৈশ্বিক বলয় ধরে রাখবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে আমেরিকার কিছু চাঞ্চল্যকর ভূ-রাজনৈতিক প্রস্তাব বা ফর্মুলা নিয়ে এই সফরে এক নতুন মেরুকরণের চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মূল উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট—দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচেটিয়া প্রভাবকে সম্পূর্ণ বাইপাস বা এড়িয়ে যাওয়া এবং আরআইসি (RIC) বা ব্রিকস (BRICS)-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর কার্যকারিতাকে একপাশে ঠেলে দেওয়া। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ হয়তো চীনকে একটি নতুন ‘দ্বিমেরু’ (Bipolar) বিশ্বকাঠামো অফার করছে, যেখানে কেবল ওয়াশিংটন এবং বেইজিং মুখোমুখি প্রধান দুই নিয়ন্ত্রক হিসেবে থাকবে। এই রূপরেখায় ঢাকাকে ব্যবহার করে এক নতুন ভূ-কৌশলগত সংযোগ সেতু গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিরল খনিজ এবং করিডোর কূটনীতি: ‘রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়ালস’ সাপ্লাই চেইনের নতুন হাব?
এই নতুন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক নাটকের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপাদান হলো ‘রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়ালস’ বা বিরল খনিজ উপাদান।
আধুনিক প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং সামরিক সরঞ্জাম তৈরির মূল চালিকাশক্তি হলো এই খনিজ।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, নেপথ্যের এই মহা-পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক বা সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা। এই নেটওয়ার্কের ভৌগোলিক বিস্তৃতি হবে অত্যন্ত চমকপ্রদ:
- পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের গেটওয়ে: খনিজ সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের প্রবেশদ্বার হিসেবে এই অক্ষ কাজ করবে।
- মিয়ানমার ও চীন করিডোর: মিয়ানমারের ভূখণ্ডকে যুক্ত করে সরাসরি চীনের মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযোগ।
- তুরস্কের করিডোর: এই রুটটি শেষ পর্যন্ত তুরস্কের করিডোরের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারের সাথে যুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ যদি এই করিডোরের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট বা সংযোগস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়,
তবে তা ঢাকার জন্য একই সাথে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং তীব্র ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির জন্ম দেবে।
চীনা নীতি ও ২০৪৯ সালের মহানির্দেশনা
যদিও এই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে সাইডলাইন বা পার্শ্ব বৈঠকের মাধ্যমে এই ‘দ্বিমেরু’ নীতিতে বেইজিংকে প্রভাবিত করার একটি তাত্ত্বিক চেষ্টা থাকতে পারে, তবে চীনের নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদী কৌশল বা ‘ডিপ পলিসি’ বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (CPC) মূল লক্ষ্য হলো ২০৪৯ সালের মধ্যে—অর্থাৎ গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্তিতে—দেশটিকে একটি অবিসংবাদিত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরাশক্তিতে রূপান্তর করা। বেইজিং খুব ভালো করেই জানে যে, এর আগে কোনো সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বা ব্লকের রাজনীতিতে জড়ানো তাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
তিহাসিক শিক্ষা: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ইতিহাস বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের খুব ভালো করেই মুখস্থ। তৎকালীন সময়ে ন্যাটো, মধ্য এশিয়া এবং খোদ চীনের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে যেভাবে মস্কোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয়েছিল, চীন আজ সেই একই ফাঁদে পা দিতে নারাজ। তারা বোঝে যে একটি কৃত্রিম দ্বিমেরু ব্যবস্থার পরিণতি শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই ধস ডেকে আনতে পারে।
‘ডিপ স্টেট’ তত্ত্ব এবং দক্ষিণ এশিয়া বিভাজনের আশঙ্কা
এই বিশ্লেষণের সবচেয়ে চরম ও আশঙ্কাজনক দিকটি হলো দক্ষিণ এশিয়ার অখণ্ডতা নিয়ে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক জুয়া।
কোনো কোনো পশ্চিমা এবং আঞ্চলিক তাত্ত্বিকের মতে, দীর্ঘমেয়াদে চীনকে অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ বা খণ্ডিত করার জন্য এক ভয়াবহ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হতে পারে।
এই তাত্ত্বিক রূপরেখা অনুযায়ী,
চীনকে আঘাত করার আগে তার চারপাশের বাফার জোন বা পেরিফেরিগুলোকে অস্থিতিশীল করা হতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে:
১. বাংলাদেশের খণ্ডাংশ বা সীমান্ত অঞ্চল
২. মিয়ানমারের অস্থিতিশীল অঞ্চল
৩. ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহ (চিকেনস নেক সংলগ্ন এলাকা)
তথাকথিত আন্তর্জাতিক ‘ডিপ স্টেট’ বা নেপথ্য শক্তির প্ররোচনায় এই অঞ্চলগুলোকে ভেঙে বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ (Non-state actors) এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়ার এক কাল্পনিক কিন্তু বিপজ্জনক ছক নিয়ে আলোচনা রয়েছে, যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের ঢাকা বৈঠক এবং নতুন বৈশ্বিক সামরিক ম্যাপিং
এই চীন সফরের ঠিক আগে ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের (Brent T. Christensen) সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিক বৈঠকগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এই বৈঠকগুলোকে কেবল সাধারণ সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন না। অনেকে মনে করছেন, বেইজিংয়ে যাওয়ার আগে ঢাকার নীতিনির্ধারকদের কাছে ওয়াশিংটনের কৌশলগত বার্তা বা ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম ছিল এটি।
ইতিমধ্যেই চীন তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের মতো বড় বিনিয়োগ থেকে নিজেদের আগ্রহ কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছে বা পুনর্বিবেচনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব বেইজিংয়ের সামনে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি কৌশলগত এবং পরিকাঠামোগত নতুন ম্যাপিং বা প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। এই সম্ভাব্য ম্যাপিংয়ের প্রধান কেন্দ্রগুলো হতে পারে:
| গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্ট | প্রস্তাবিত ভূ-কৌশলগত ভূমিকা |
| মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর | গভীর সমুদ্র বন্দর সুবিধা এবং আঞ্চলিক নৌ-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ |
| চট্টগ্রাম অস্ত্র শিল্প | সামরিক প্রযুক্তির যৌথ উৎপাদন ও আধুনিকায়ন |
| রংপুর ও লালমনিরহাট বিমান ঘাঁটি | কৌশলগত বিমান প্রতিরক্ষা এবং এভিয়েশন লজিস্টিকস হাব |
| মিয়ানমার করিডোর | দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সরাসরি স্থল ও জ্বালানি সংযোগ |
ঢাকার ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট বা ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা
প্রফেসর ডক্টর আরিফ খানের এই গভীর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে,
তারেক রহমানের এই চীন সফর কেবল কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা মোউ (MoU) স্বাক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এটি আসলে একবিংশ শতাব্দীর নতুন ঠান্ডা লড়াইয়ের (New Cold War) এক জটিল দাবার চাল।
বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে নিজের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) বজায় রাখতে হবে।
কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে বা দ্বিমেরু ব্যবস্থার ফাঁদে অন্ধভাবে পা না দিয়ে, বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা যদি এই ভারসাম্যের খেলায় সফল হতে পারে, তবেই এই সফর বাংলাদেশের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে;
অন্যথায় বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ছায়া-যুদ্ধের বলি হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
