দেশে কালেমার পতাকা বিতর্ক ও মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদী প্রশিক্ষণের অভিযোগ। থমথমে পরিস্থিতিতে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশজুড়ে ধর্মীয় ও কৌশলগত নানা প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট উগ্রপন্থী মহলের আহ্বানে দেশব্যাপী বিতর্কিত বা নিষিদ্ধ সংগঠনের আদলে বিশেষ এক পতাকার প্রসারের পর থেকেই দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আত্মরক্ষা বা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে একদল তরুণের সন্দেহজনক রণপ্রস্তুতির চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, কারাতে বা জুডোর মতো খেলার আড়ালে মূলত উগ্র ভাবাদর্শের বিস্তার এবং এক ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণের মহড়া চলছে। এই তরুণদের শারীরিক ভাষা, আচরণ ও কথাবার্তা বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এরা ইতিমধ্যেই উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা থেকে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন তরুণকে আটক করা হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর পক্ষে উস্কানিমূলক প্রচার-প্রচারণা থামেনি।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবমাননা ও প্রশাসনের নীরবতা
ঢাকা মহানগরীতে সন্দেহভাজন তরুণদের আটকের পর একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল এবং কতিপয় বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রমাগত উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর বৈধ পদক্ষেপকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি পুলিশসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রকাশ্যে জনসমক্ষে হেনস্থা ও অপমান করা হচ্ছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সমস্ত প্রকাশ্য অপতৎপরতা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে অবমাননা করার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। নীতিনির্ধারকদের এই রহস্যজনক নীরবতা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে সন্দিহান করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভাবমূর্তি এক গভীর সংকটের মুখে পড়বে।
পেছনের সমীকরণ: সরকারি নীতি ও রাজনৈতিক ঘোষণা
বর্তমান পরিস্থিতির সূত্রপাত ও এর গভীরতা বুঝতে হলে গত বছরের কিছু সুনির্দিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক বিবৃতির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিগত ২০২৫ সালে তৎকালীন প্রশাসনের অন্যতম প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছিলেন।
তার ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের ৭টি বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রাথমিকভাবে মোট ৮,৮৫০ জন তরুণকে কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্ডোর পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র চালনার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সরকারিভাবে তরুণদের আগ্নেয়াস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই উদ্যোগ তৎকালীন সময়েও নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল।
সমসাময়িক রাজনৈতিক মেরুকরণ:
- জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান: ২০২৫ সালেরই ২৭ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের ঘোষণা দেন যে, তাদের ৫০ লাখ যুবক দেশের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ হিসেবে যেকোনো আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত।
- জোটগত সমীকরণ: রাজনৈতিক অঙ্গনে এনসিপি (NCP) এবং জামায়াতের পারস্পরিক কৌশলগত সম্পর্ক এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়।
লুণ্ঠিত অস্ত্রের ঝুঁকি ও সন্ত্রাসবাদের নতুন ক্ষেত্র
২০২৪ সালের রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থান এবং পটপরিবর্তনের সময় দেশের প্রায় প্রতিটি থানা ও নিরাপত্তা চৌকি থেকে শত শত অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এবং হ্যান্ড গ্রেনেড লুট হয়েছিল।
একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হলেও,
গত দুই বছরে এই লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান মহোদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মার্শাল আর্ট ক্লাবের নামে যে সমস্ত সন্দেহভাজন দল গড়ে উঠছে,
তাদের পেছনে যদি এই লুণ্ঠিত অস্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত হয়, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে।
এনসিপি নেতার সম্পৃক্ততা ও ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা
ঢাকায় উগ্রবাদী ও সন্দেহজনক তৎপরতার অভিযোগে যে ছয়জন যুবককে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেপ্তার করেছে,
তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ একজন সদস্য সরাসরি এনসিপির (NCP) রাজনীতির সাথে যুক্ত।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরপরই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলটি তড়িঘড়ি করে উক্ত নেতাকে দল থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়।
তবে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে,
এটি মূলত অপরাধের গভীরতা থেকে জনদৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো বা ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র একটি চেনা কৌশল মাত্র।
গুঞ্জন রয়েছে,
আটককৃত এই রাজনৈতিক কর্মীকে পেছন দরোজা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ওপর মহল থেকে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
যদি শেষ পর্যন্ত এই সন্দেহভাজনদের কোনো বিচার ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়,
তবে এই উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের আসল ইন্ধনদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী এবং অর্থদাতাদের মুখোশ কখনোই উন্মোচিত হবে না।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও সার্বভৌমত্বের সংকট
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বেসামরিক নাগরিকদের একটি বড় অংশকে মার্শাল আর্টের আড়ালে অস্ত্র ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার এই প্রবণতা কোনো সুস্থ সংকেত নয়।
এটি একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলাকে বিঘ্নিত করছে,
অন্যদিকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কোনো মহলের পরোক্ষ ইন্ধন বা পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এই ধরনের উগ্র নেটওয়ার্ক দেশজুড়ে বিস্তৃত হওয়া অসম্ভব।
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই তথাকথিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর উৎস অনুসন্ধান করা
এবং এদের পেছনে থাকা মূল রাজনৈতিক মাস্টারমাইন্ডদের আইনের আওতায় আনা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দাবি।
