হবিগঞ্জে গাড়িবহরে হামলা ও মারধরের ঘটনায় বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা।
নিজস্ব প্রতিবেদক, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার:
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় কঠোর বাধা, ১৪৪ ধারা এবং নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করতে না পেরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতারা। মঙ্গলবারের অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও নেতাকর্মীদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের বিচার চেয়ে এই অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন পুলিশ প্রশাসন মামলাটি এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না, সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন দলটির ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।

বুধবার (২৯ জুলাই) দিবাগত রাতে বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রুহুল আমিন তালুকদার সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে এসে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং গত মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা দিয়ে সেখান থেকে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। বর্তমানে গোটা এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ দায়ের ও মামলার বিবরণ
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতের দিকে এনসিপির শীর্ষ নেতারা যখন কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে পৌঁছান, তখন তাদের সঙ্গে দলের কর্মী-সমর্থকরাও উপস্থিত ছিলেন। লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সময় ফাঁড়িতে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহসহ আরও বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।
উক্ত অভিযোগে বাদী করা হয়েছে হবিগঞ্জ জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তারেক রুবেলকে। পুলিশ জানিয়েছে, এই লিখিত অভিযোগটি পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সদর মডেল থানায় باقاعدہ মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হবে। দায়েরকৃত অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এবং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে আসামিদের পূর্ণাঙ্গ নাম প্রকাশ করা হয়নি।
মহাসড়কে অবস্থান ও নাহিদ ইসলামের কড়া হুংকার
পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর রাত পৌনে নয়টার দিকে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এ সময় তিনি বর্তমান প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “পুলিশ যদি প্রকৃতপক্ষে তাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে চায় এবং সাবেক স্বৈরাচারী আমলের দলীয়করণের দুর্নাম থেকে নিজেদের ইমেজ উদ্ধার করতে চায়, তবে মঙ্গলবারের এই ন্যক্কারজনক হামলার উপযুক্ত ও দৃশ্যমান বিচার করতে হবে। আজকের রাতের মধ্যেই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আসামিরা যেন কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে বা এলাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পায়।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হয়, তবে সাধারণ মানুষ ধরে নেবে যে এই রাষ্ট্রে এখনো ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো পরিবেশ নেই এবং এটি একটি মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আমরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দেখতে পাচ্ছি যে, বর্তমান সরকারও পুরোনো আমলের স্বৈরাচারী পথ ধরেই হাঁটছে। তারা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে পাশ কাটিয়ে দেশটাকে চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ তারা জনগণের গণরায়কে সম্মান জানায়নি এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করেনি। এর মাধ্যমে মূলত তারা আগের মতো একটি সন্ত্রাসনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখতে চাইছে।”
শ্রীমঙ্গল থেকে শুরু হওয়া বাধা ও দীর্ঘ নাটকীয়তা
এর আগে বুধবার বিকেলের দিকে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও এলাকায় অবস্থিত
বিখ্যাত ‘চা-কন্যা’ ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে এনসিপির সুসজ্জিত গাড়িবহর প্রথম দফায় আটকে দেয় পুলিশ।
হবিগঞ্জের দিকে যাওয়ার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের যাত্রাপথ নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করে।
এ সময় এনসিপির নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে মহাসড়কের ওপরই তাদের গাড়ি থামিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এনসিপি নেতাদের তুমুল বাকবিতণ্ডা ও আলোচনা চলে।
সমস্ত বাধার দেয়াল ভেঙে শেষ পর্যন্ত বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তারা ওই এলাকা ত্যাগ করে হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে ফের রওনা দেন।
কিন্তু পথিমধ্যে বাহুবল এলাকায় পৌঁছানোর পর প্রশাসনের পক্ষথেকে ১৪৪ ধারা জারির কথাবলে পুনরায় তাদের পথরোধ করা হয়। দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টি ও
রাস্তায় অবস্থানের পর তারা শেষপর্যন্ত মহাসড়কের পাশেই কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সেখান থেকে মৌলভীবাজারের দিকে ফিরে যান।
মঙ্গলবারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পটভূমি
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বিকেলে হবিগঞ্জ শহরের সাইফুর রহমান টাউন হলের সামনে এনসিপির পূর্বনির্ধারিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সভা শেষে কেন্দ্রীয় নেতারা যখন গাড়িবহরে করেসার্কিট হাউসের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন সবুজবাগ এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় যুবদলের কঠোর বিরোধিতার মুখে পড়েন।
মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং এনসিপির গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। জীবন বাঁচাতে ও নিজেদের রক্ষা করতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
এবং সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখার ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন।
ওই সময় দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাঘটে, যাতে সারজিস আলমসহ অন্তত কুড়ি জন নেতাকর্মী আহত হন।
গভীর রাতে পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাদের উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নেওয়া হয় এবং রাতেই তারা মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
এই ঘটনার জেরে পরদিন অর্থাৎ বুধবার সকাল থেকেই হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মাঠে নামে বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ।
এনসিপি নেতাদের এই লিখিত অভিযোগ দায়েরের মধ্য দিয়ে এখন গোটা অঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আইনি লড়াইয়ের সূচনা হলো।
