ঈদুল আজহায় ব্যাংক বন্ধ থাকায় গ্রাহকরা নির্ভর করছেন এটিএম বুথের ওপর। কিন্তু বুথে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় তৈরি হয়েছে তীব্র ভোগান্তি। ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির ঘাটতির বিশ্লেষণ।

ঈদুল আজহার ১০ দিনের ছুটি (৫-১৪ জুন) চলাকালে দেশের এটিএম বুথগুলোতে নগদ টাকার সংকট যেন আরেকটি “ঈদ দুর্ভোগে” পরিণত হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশের হাজার হাজার গ্রাহককে নগদ টাকার জন্য এক বুথ থেকে আরেক বুথে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। হাসপাতাল, জরুরি চিকিৎসা, পরিবারের প্রয়োজনে কিংবা একান্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনেকেই পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
বংশাল এলাকার বাসিন্দা রহমান যখন এক আত্মীয়কে হাসপাতালে ভর্তি করতে যাচ্ছিলেন, তখন একটি এটিএম বুথে গিয়ে দেখতে পান টাকার লেশমাত্র নেই। এরপর আরও চারটি বুথ ঘুরেও ব্যর্থ হয়ে শেষে বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার নিতে বাধ্য হন।
ধানমণ্ডির পোশাককর্মী রুনা আক্তার তার বোনকে টাকা পাঠাতে গিয়ে ঘুরে বেড়ান পাঁচটি বুথ। অবশেষে মিরপুর গিয়ে তিনি টাকা তুলতে সক্ষম হন।
এই চিত্র শুধু রাজধানীর নয়, সারাদেশের। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক ঈদের আগেই (২৯ মে) নির্দেশনা দিয়েছিল, প্রতিটি ব্যাংককে তাদের এটিএম বুথে পর্যাপ্ত টাকা রাখতে হবে। সেই নির্দেশনা কতটা কার্যকর হয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাস্তব অভিজ্ঞতায়।
এটিএম ব্যবস্থাপনায় একটি সুস্পষ্ট কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। শাখা–সংলগ্ন বুথগুলোতে টাকা রিফিল হয় সেই শাখা থেকেই। কিন্তু ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় এসব বুথে নতুন করে টাকা ভরার সুযোগ ছিল না। স্বাধীন বুথগুলোতেও সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না।
অনেক বুথে রয়েছে ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম), যেখানে একজন টাকা জমা দিলে আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে তুলছেন। এভাবে লেনদেন চললেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, সব ব্যাংক কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মানেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন সময়ে নির্দেশনা দেওয়ার পরেও যদি বাস্তবায়ন তদারকি না হয়, তাহলে এর দায় কে নেবে?
ব্যাংকগুলোর অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি:
ছুটির মধ্যে বুথে নগদ অর্থ নিশ্চিত করতে কার্যকর রোস্টার, রিফিল টিম এবং পর্যাপ্ত নগদ মজুদের ব্যবস্থা ছিল না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং দুর্বলতা:
নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি ছিল না।
তথ্য ও সমন্বয়ের ঘাটতি:
গ্রাহকদের বুথে যাওয়ার আগে অনলাইন বা অ্যাপে বুথে ক্যাশ আছে কিনা—এমন তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে ব্যাংকগুলো।
ঈদ বাঙালির জীবনে খুশির বার্তা বয়ে আনে, কিন্তু এই খুশির দিনগুলোতে যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার এমন লজ্জাজনক ব্যর্থতা দেখা দেয়, তা শুধু জনসাধারণের ভোগান্তিই বাড়ায় না, বরং একটি রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার উপর আস্থা কমায়। এই ব্যর্থতার দায় শুধু ব্যাংকের নয়, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ গোটা আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার এক করুণ দলিল।
