ইআরপিপি প্রকল্পের কর্মীরা চাকরি স্থায়ী ও বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে শাহবাগে বিক্ষোভ করেছেন। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের মেয়াদ, প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতা নিয়ে বিশ্লেষণ এই প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এক প্রান্তিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্প। এক সময় যারা জীবন বাজি রেখে সেবাদান করেছেন, আজ তারা বেকারত্বের মুখে। ১৯ জুন বৃহস্পতিবার, শতাধিক ইআরপিপি কর্মী শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে তাদের চাকরি পুনর্বহাল ও বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে সরব হন।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব শুরুর পর, দেশের স্বাস্থ্যখাতে জরুরি জনবল চাহিদা মেটাতে ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় নিয়োগ পান হাজারো স্বাস্থ্যকর্মী। তাদের বেতন পরিশোধের দায়িত্ব নেয় বিশ্ব ব্যাংক। প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২০ সালে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ৩০ জুন। কিন্তু ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বরেই বিশ্ব ব্যাংকের ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

যদিও চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রকল্পের মেয়াদ ৬ মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবু প্রকল্পের কর্মীরা চাকরি স্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা পাননি।
সকাল ১১টায় অবস্থান কর্মসূচি শুরুর পর আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, “চাকরি স্থায়ী না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না।” তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে গিয়ে দাবি জানানো
কিন্তু পুলিশের বাধায় তাদের পথ ঘুরে যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের দিকে। বেলা ১টায় পুলিশ প্রহরায় মিছিল করে প্রেসক্লাব অভিমুখে রওনা হন তারা।

কর্মী আরিফ হোসেন বলেন, “কোভিড মহামারীর সময় আমাদের জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আমাদের কথা কেউ রাখেনি। প্রতিশ্রুতি ছিল, প্রকল্প বাড়বে। এখনো আমরা বেতন পাইনি।”
নারী কর্মী ঝর্না দাস বলেন, “আমরা জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি। আজকে সেই অবদান কেউ মনে রাখছে না। আমাদের সংসার চালানো দায় হয়ে গেছে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বলছে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু অর্থায়নের নিশ্চয়তা মেলেনি। অথচ ২০২০-২৪ সময়কালে এই কর্মীরাই বাংলাদেশের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি ছিলেন। প্রশ্ন উঠেছে—এই জনবলকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?
এই ঘটনা কেবল একটি চাকরির ইস্যু নয়—এটি স্বাস্থ্য প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতি সংকটের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্প-নির্ভর জনবল ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে, যেকোনো সময় নীতিগত ব্যর্থতা মানবিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতের এইসব প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ীকরণ প্রশ্নে সরকার যদি নির্লিপ্ত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নিয়োগে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। সরকারের উচিত—এই পরিস্থিতিতে স্বচ্ছতা, মানবিকতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।
