ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে শেখ হাসিনা বলেন— স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন না এবং ইউনুস সরকারের দমন-পীড়নের সমালোচনা করেন।
ভারতের শীর্ষ দৈনিক The Indian Express–কে দেওয়া এক বিশেষ ই-মেইল সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের অপসারিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন— “স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া আমি দেশে ফিরবো না।”
২০২৪ সালের আগস্টে দেশত্যাগের পর থেকে তিনি বর্তমানে দিল্লির এক অজ্ঞাত নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন বলে পত্রিকাটি জানিয়েছে।





ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস এমন একটি প্রশাসন তৈরি করেছেন যেখানে “চরমপন্থীরা প্রভাব বিস্তার করছে, আর দেশে তৈরি হয়েছে ভয়, দমন-পীড়ন ও অনিশ্চয়তার শাসনব্যবস্থা।”
তিনি দাবি করেন— আন্তর্জাতিক ও দেশীয় স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবে বাংলাদেশকে একটি “regime of fear”–এ পরিণত করা হয়েছে, যেখানে বাকস্বাধীনতা সীমিত, বিরোধী মত দমন করা হচ্ছে এবং জনগণের ভোটাধিকারকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে।
নিজের ১৫ বছরের শাসনব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান
সমালোচকদের অভিযোগ— দুর্নীতি, কর্তৃত্ববাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন— শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
তার ভাষায়—
“আমার সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে অগ্রগতি করেছে তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।”
তিনি এটিও বলেন—
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে শুধু রাজনৈতিক চক্রান্তের কারণেই।
অবস্থান পরিষ্কার: “আমি পালাইনি, বরং সময়ের অপেক্ষায় আছি”
অনেকে তাকে পালিয়ে যাওয়া নেতা হিসেবে আখ্যা দিলেও, শেখ হাসিনা তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন—
“বাংলাদেশ আমার দেশ। আমি পালাইনি। আমি সাময়িকভাবে নিরাপত্তার প্রয়োজনেই বাইরে আছি। দেশে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই ফিরে যাব।”
তার বক্তব্যে দুইটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট:
- তিনি শুধুমাত্র জনগণের রায়কে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বৈধতার উৎস হিসেবে মানেন।
- বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে তিনি অবৈধ ও অনির্বাচিত বলে দাবি করেন।
“বাংলাদেশ আবার উঠবে”— আশাবাদী শেখ হাসিনা
সাক্ষাৎকারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন—
বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের পক্ষে দৃঢ়, এবং দেশের ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই নিরাপদ।
তার কথায়—
“Bangladesh will rise again”— বাংলাদেশ আবার উঠে দাঁড়াবে, কারণ এই জাতির স্থিতিশীলতা, দৃঢ়তা এবং গণতান্ত্রিক চেতনা তুলনাহীন।
বিশ্লেষণ: সাক্ষাৎকারের রাজনৈতিক তাৎপর্য
এই সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
১️⃣ গণতন্ত্র বনাম অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রশ্ন
হাসিনার বক্তব্য স্পষ্ট—
দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে,
যার নেতৃত্বে এমন ব্যক্তি রয়েছেন যাকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন।
২️⃣ আন্তর্জাতিক বার্তা
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে সাক্ষাৎকার দেওয়া নিছক কাকতালীয় নয়।
এটি ভারতের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিসরে শক্তিশালী কূটনৈতিক বার্তা পাঠানোর লক্ষ্য বহন করে—
বাংলাদেশের গণতন্ত্র হুমকিতে, এবং তার নেতৃত্ব এখন বিদেশে অবস্থান করতে বাধ্য।
৩️⃣ দেশে ফেরার শর্ত হিসেবে “স্বাধীন নির্বাচন”
তার এই বক্তব্য অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মহলকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে আরও সতর্ক হতে বাধ্য করতে পারে।
শেষকথা
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার শুধু এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নয়—
এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের গভীর সংকেত।
একটি অস্থির রাষ্ট্রীয় পরিবেশের প্রতিচ্ছবি,
এবং ভবিষ্যতের রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
