ওয়াশিংটনে আফগান নাগরিকের হামলা ঘিরে পাকিস্তানের অভিযোগ ও আইএসআই যোগাযোগ প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দেখছেন গভীর দ্বিচারিতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আফগান নাগরিকের হামলার ঘটনায় পাকিস্তান সরকার কঠোর ভাষায় আফগান তালেবান সরকারের সমালোচনা করেছে। তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দাবি করেন—
“পাকিস্তানও আফগান মাটি থেকে সন্ত্রাসের শিকার। তালেবান সরকার আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।”
(Source: Dawn, Al Jazeera reports on Pakistan-Afghanistan diplomatic tensions)
কিন্তু এই বিবৃতির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে পাকিস্তানের দ্বিমুখী নীতি, যেটি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছে—বিশেষ করে যখন আইএসআই–এর মাধ্যমে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সহায়তার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
হামলার পেছনে আইএসআই-এর ছায়া
বাংলাদেশ, ভারত ও আফগানিস্তানের কয়েকজন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক দাবি করছেন—
- পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ, লজিস্টিক ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
- ওয়াশিংটনের হামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিও টাকা পেয়ে কাজ করেছে, এবং সন্দেহের তীর উঠছে আইএসআই–এর দিকে।
এই অভিযোগ সরাসরি মার্কিন সংস্থা বা সরকার নিশ্চিত না করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে ঘটনাটি পাকিস্তানের প্রচলিত “প্রক্সি যুদ্ধ কৌশল”–এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পাকিস্তানের অভিযোগ: তালেবান সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে—
- আফগান তালেবান সরকার নিজেদের ভূখণ্ডে টিটিপি, আইএসকে’সহ একাধিক জঙ্গি সংগঠনকে দমন করতে ব্যর্থ।
- আফগান মাটি থেকে পাকিস্তানে হামলা বাড়ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
পাকিস্তান নিজ ভূখণ্ডে সক্রিয় জাতিসংঘ/মার্কিন-মনোনীত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কি করছে
নীরব পাকিস্তান: আইএসআই–এর “পৃষ্ঠপোষক” ভূমিকায় কোনো মন্তব্য নেই
যখন পাকিস্তান প্রকাশ্যে তালেবানকে অভিযুক্ত করছে, তখন একই সময়ে তারা নীরব রয়েছে তিনটি স্পর্শকাতর বিষয়ে—
১. পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের অধীনে জঙ্গি গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়
বিভিন্ন গবেষণা ও থিঙ্ক-ট্যাংক রিপোর্টে এসেছে—
- লস্কর-ই-তৈবা (LeT),
- জইশ-ই-মোহাম্মদ (JeM),
- হিজবুল মুজাহিদিন,
পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলে অদৃশ্য সহায়তা পেয়ে থাকে।
(Reference: UN Security Council Analytical Support and Sanctions Monitoring Team Report, 2023–24)
২. আফগান ও মধ্য এশীয় জঙ্গিদের পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পুনর্গঠন
তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুললেও পাকিস্তান নিজ ভূখণ্ডে জঙ্গিদের পুনর্গঠনের বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
৩. আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতায় অতীত ভূমিকার কোনো দায় স্বীকার নেই
২০০১–২০২১ পর্যন্ত আফগানিস্তানে তালেবানকে সংগঠিত করতে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
বিশ্লেষণ: পাকিস্তান কি দোষ চাপিয়ে দায় এড়াতে চাইছে?
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকদের মতে—
- পাকিস্তান বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট,
- রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা,
- এবং উগ্রবাদী হামলার পুনরুত্থান–এর চাপে রয়েছে।
এ অবস্থায় তারা চায় আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের “সন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র” হিসেবে উপস্থাপন করতে।
কিন্তু একই সঙ্গে আইএসআই–এর কার্যকলাপ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ বা স্বচ্ছতা নেই, যা পাকিস্তানের বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
উপসংহার
ওয়াশিংটনের হামলার পর পাকিস্তানের কড়া বিবৃতি বাস্তবে তাদের দ্বিচারিতাকে আরও উন্মোচন করেছে।
একদিকে তারা তালেবানকে দায়ী করছে, অন্যদিকে নিজেদের জমিতে জাতিসংঘ/মার্কিন-মনোনীত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি—এবং আইএসআই–এর পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব।
এই জটিল অবস্থার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হতে পারে।
তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত—
পাকিস্তানের অভিযোগ যেমন যাচাই করা, তেমনই তার নিজস্ব ভূমিকাও সমানভাবে তদন্ত করা।
