ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে লুটেরাদের কঠোর হুশিয়ারি দিলেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার ও হাজারও মানুষ গ্রেপ্তার।
সংবাদ প্রতিবেদন
ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্সে এখন উত্তাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নাজুক অবকাঠামোর প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির দুর্বৃত্ত দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাট চালিয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফরাসি সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত রোববার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ দাঙ্গা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দেন। ফরাসি প্রশাসন মনে করছে, সাধারণ মানুষের ন্যায্য প্রতিবাদের আড়ালে একটি বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দেশে অরাজকতা তৈরির পাঁয়তারা করছে। উদ্ভূত এই সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন সর্বাত্মক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ম্যাক্রোঁর ভাষণ ও উগ্র বামপন্থীদের প্রতি কঠোর বার্তা
জাতির উদ্দেশে দেওয়া সেই টেলিভিশন ভাষণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট দেশের বর্তমান সামাজিক অস্থিরতার নানা দিক তুলে ধরেন। সরকারের অন্য শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীদের মতো তিনিও এই সহিংসতার জন্য মূলত উগ্র বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদের দায়ী করেছেন। তার মতে, পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে এসব কর্মী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, যারা ফরাসি ভূখণ্ডে লুটপাট চালিয়েছে, তাদের অবশ্যই এই ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ আর্থিক দায়ভার নিতে হবে। একই সঙ্গে যারা গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করতে চেয়েছে, তাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। উগ্র বামপন্থী দলগুলোর কিছু বিদ্রোহী উপদল এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ অপরাধীদের চালানো এই ধ্বংসাত্মক সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
সরকারি দপ্তরে হামলা ও লিমোগেস সিটি হলের করুণ পরিণতি
বিক্ষোভের এই দাবানল দেশের বিভিন্ন বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। মুখোশ পরিহিত কিছু উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী বিভিন্ন শহরে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্নিসংযোগ এবং সিটি হলগুলোতে ভাঙচুর চালায়। এর ঠিক পরপরই প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ সরকারের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন।
মধ্য ফ্রান্সের ঐতিহাসিক লিমোগেস শহরে এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। সেখানে ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী একটি প্রাচীন সিটি হলে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করে।
এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ফলে ঐতিহাসিক ভবনটির ছাদ সম্পূর্ণ ধসে পড়ে এবং পুরো স্থাপনাটি প্রায় পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাবর সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন এখন অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
সরকারের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ ও ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে ফরাসি সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।
আগামী দিনগুলোতে সরকারি ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মেয়রদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানোর কথা বলা হয়েছে।
এমনকি আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটলে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট স্থানে বিক্ষোভ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
এখন পর্যন্ত চলমান এই সহিংসতা ও লুটপাটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত দুই হাজার চারশ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা এবং দেশের শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের এই কঠোর অভিযান আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে।
