৩১৬ থেকে ১৪০০ অতঃপর ৮৩৪—কীভাবে জুলাইয়ের মৃত্যুর সংখ্যা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হলো? ৫ আগস্ট ২০২৪-এর সংবাদপত্রের দলিল দিয়ে উন্মোচিত হলো জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের পতন কেন্দ্র করে গঠিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মৃতের সংখ্যা নিয়ে নানা পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। বিভিন্ন সময় সরকারি খাত, মানবাধিকার সংগঠন এবং শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে নিহতের গণনায় পার্থক্য দেখা গেছে।
জুলাই আন্দোলনের মৃত্যুর হিসাব ও মিথ্যেচারের কালো ইতিহাস
জুলাই আন্দোলনের মৃত্যুর হিসাব নিয়ে চলছে ভয়াবহ মিথ্যেচার। সংখ্যার এই কারসাজি দেশের মানুষের সাথে এক নিষ্ঠুর প্রতারণা। শহীদের সংখ্যা ৩১৬ থেকে ২০০০ অতঃপর ৮৩৪ করা হয়েছে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের ইউনূসের ব্যক্তিগত বন্ধু জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ককে ঢাকায় ডেকে আনা হলো। শিবির নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠকের চক্রান্তের পর তুর্ক ঘোষণা দিলেন – ১৪০০ শহীদ।
এই কাল্পনিক অংকের পেছনের সত্যতা কেউ কি ভেবেছেন? ৫ আগস্টের জাতীয় পত্রিকার পাতায় লুকিয়ে আছে আসল তথ্য।
সেদিনের সংবাদপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে মোট নিহতের সংখ্যা ৩১৬। এই ৩১৬ জনের মধ্যে ছিলেন পুলিশ সদস্য ও কর্মীরা।
থানা আক্রমণ করতে গিয়ে নিহতরা এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাহলে কীভাবে এই সংখ্যা রাতারাতি হাজারে পৌঁছাল?
ইতিহাস বিকৃতির এই খেলায় নেমেছে বর্তমান সুবিধাবাদী চক্র। ওসমানী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভের পাশে তৈরি হয়েছে স্তম্ভ।
একাত্তরের ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। একটি কাল্পনিক সংখ্যাকে মহিমান্বিত করার অপচেষ্টা চলছে। অথচ ৫ আগস্ট ২০২৪ এর সমকাল পত্রিকা অন্য কথা বলে। সেদিন স্পষ্ট জানানো হয়েছিল ৪ আগস্ট পর্যন্ত নিহত ৩১৬। এর মধ্যে শুধু ৪ আগস্টেই প্রাণ হারান ১০১ জন। পুলিশের ওপর হামলা এবং থানায় আক্রমণের সময় বহু হতাহত হয়।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং সাধারণ হামলাকারীরাও সেদিন মারা যান। ক্রসফায়ার ও দ্বিমুখী সংঘর্ষের বলি হয়েছিল কিছু মানুষ।


সংবাদপত্রের প্রথমিক তথ্য ও পরিসংখ্যানগত রূপরেখা
সংবাদপত্রের প্রাথমিক রিপোর্টে ১৬ জুলাই থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত প্রতিদিনের নিহতের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করলে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
- সমকালের হিসাব: ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে ৪ আগস্টের সংঘাত সহ সারাদেশে মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৩১৬ জন।
- প্রথম আলোর বিশ্লেষণ: পরবর্তীতে প্রথম আলো প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৬ জুলাই থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫৮০ জন।
- পরবর্তী সহিংসতা: ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বেশ কিছুদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে।


নিহতের তালিকায় বিভিন্ন পেশা ও পরিচয়ের মানুষ
প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে দেখা যায় যে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কেবল বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরাই নন, বরং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
১. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য: আন্দোলন চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন থানায় হামলায় বহু পুলিশ সদস্য নিহত হন।
২. রাজনৈতিক নেতাকর্মী: সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের নেতা, কর্মী ও সমর্থক সংঘাত এবং হামলায় প্রাণ হারান।
৩. সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থী: গুলি ও দ্বিমুখী সংঘর্ষের মাঝে পড়ে বহু সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটে।


থানা আক্রমণ ও সন্ত্রাসীদের মৃত্যুর হিসাব জালিয়াতি
পুলিশ বাহিনীর ওপর চালানো নৃশংসতার ইতিহাস কারো অজানা নয়। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় ১৩ জন পুলিশকে হত্যা করা হয়।
সারাদেশে ২৭টি থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট করা হয়েছিল। জেলখানা ভেঙে দাগী আসামি ও জঙ্গিদের মুক্ত করা হয়।
সংঘাতের দিনগুলোতে দুই সহস্রাধিক শহীদের গল্প ছড়ানো হয়েছিল। বাজার যখন সেই গল্পে টিকল না, তখন নতুন চাল চাললেন।
অনুগতদের দিয়ে তালিকা করিয়ে সংখ্যা ৮৬৪ করা হলো। কাটছাঁট করে সেই সংখ্যা নামিয়ে আনা হলো ৮৩৪ জনে।
এরপর ব্যক্তিগত বন্ধু ভলকার তুর্ককে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। গোপন বৈঠক শেষে তুর্ক ঘোষণা দিলেন চৌদ্দশ শহীদের নাম।

নিজেদের তৈরি করা সংখ্যা নিয়ে নিজেরাই আজ দোদুল্যমান। প্রথম আলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মোট নিহত ৫৬০ জন। এর মধ্যে ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত ২১৭ জন। ৪ থেকে আগস্ট এই তিন দিনে মারা যান ৩২৬ জন। এই তিন দিনে নিহতদের মধ্যে অনেকে ছিলেন রাজনৈতিক দলের। পুলিশ সদস্য মারা গেছেন ৩৬ জন এবং সাধারণ কর্মীও। তাহলে এই মৃত্যুর তালিকা কীভাবে চৌদ্দশ জনে পৌঁছাল? ৫ আগস্ট দুপুরের পর শুরু হয় আসল ধ্বংসযজ্ঞ ও তাণ্ডব।
চার শতাধিক থানায় হামলা ও শত শত পুলিশকে হত্যা করা হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে সবকিছু লুট হয়।
৫ আগস্টের পত্রিকাতেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য
থানা লুট করতে গিয়ে বা জেল ভাঙলে কি সবাই শহীদ? সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিহতদের জুলাই শহীদের তালিকায় ঢুকানো হয়েছে। সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর এই নোংরা রাজনীতি জাতির সাথে বেঈমানি। সাতক্ষীরার প্রতাপনগরে হামলা চালাতে গিয়ে নিহতরা কি শহীদ? চাঁদপুরের সেলিম খান ও তাঁর ছেলেকে মারার ঘটনাও রয়েছে। বরিশালে সাবেক মেয়রের বাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানো হলো। এই অপরাধীদের মৃত্যুর হিসাবও কি শহীদের তালিকায় যাবে? সন্ত্রাসীদের রক্ষা করতে গিয়ে ভুয়া ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সুবিধভোগী গোষ্ঠী তাদের বৈধতা অর্জনে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই মিথ্যাচার ক্ষমা করবে না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর এক বিশাল আঘাত নেমে এসেছে। ওসমানী উদ্যানের পবিত্র মাটিতে কাল্পনিক স্তম্ভ বসানো হয়েছে। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে এই বেইমানি সহ্য করা যায় না। ইতিহাস একদিন এই জালিয়াতদের মুখোশ উন্মোচন করবে নিশ্চিত। সন্ত্রাসীদের গুণগান গেয়ে যারা টিকে আছে তাদের পতন হবে। তথ্য প্রমাণ বলে জুলাইয়ের মৃত্যুর হিসাব পুরোটাই ভুয়া। পত্রিকার পাতা উল্টালেই এই অপরাধের দলিল স্পষ্ট দেখা যায়। দেশবাসীর উচিত এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। আসুন আমরা সঠিক ইতিহাস জেনে এই জালিয়াতির প্রতিবাদ করি। সত্যের জয় একদিন হবেই এবং মিথ্যাচারীদের পতন আসবে।
