মহান মুক্তিযুদ্ধের অসীম সাহসী বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
মুক্তিবার্তা৭১ প্রতিবেদক অনলাইন ডেস্ক
আজ ২৯ অক্টোবর, বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, মহান মুক্তিযুদ্ধের অদম্য সাহসিকতার প্রতীক বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের জন্মবার্ষিকী। দুঃখ-দুঃসময়ে যিনি দেশের টানে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর সেই গৌরবময় আত্মত্যাগ চিরকাল আমাদের পথ দেখাবে। আজকের এই দিনে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে পুরো দেশ।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
১৯৪১ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডের ঐতিহাসিক মোবারক লজে জন্মগ্রহণ করেন মতিউর রহমান। তাঁর বাবার নাম মৌলভী আব্দুস সামাদ এবং মায়ের নাম মোবারকুন্নেসা। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন পরিবারের অষ্টম সদস্য। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে এক ধরনের ব্যতিক্রমী জেদ ও নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ বিকশিত হয়েছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা এবং অন্যান্য কার্যক্রমে তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল দেখার মতো।
প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাবলিক স্কুলে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। বিমান চালনার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
বিমান বাহিনীতে বর্ণাঢ্য কর্মজীবন
১৯৬১ সালে মতিউর রহমান পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ফ্লাইট ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। কঠোর প্রশিক্ষণ ও মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি ১৯৬৩ সালে কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার পাইলট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি পান।
তাঁর কর্মদক্ষতা শুধু দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরানের রানির সম্মানে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক বিমান মহড়ায় তিনি একমাত্র বাঙালি পাইলট হিসেবে অংশ নেওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সৎ ও নির্ভীক হওয়ায় সহকর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সমাদৃত। তবে মনেপ্রাণে তিনি সবসময় বাংলাকে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে ভালোবেসে গেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক বন্ধন
১৯৬৮ সালের ১৯ এপ্রিল মিলি খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মতিউর রহমান। তাদের সুখের সংসারে জন্ম নেয় দুটি কন্যাসন্তান—মাহিন ও তুহিন। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকেও তিনি পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতেন। একজন আদর্শ স্বামী এবং স্নেহময় পিতা হিসেবেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে দেশের মুক্তির মহান ব্রতে রূপান্তরিত করে।
মুক্তিযুদ্ধ ও ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বার্ষিক ছুটিতে সপরিবারে ঢাকায় আসেন মতিউর রহমান। এই সময় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তৎকালীন স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে তিনি গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১ মার্চ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা করেননি। বরং ২৫ মার্চ নরসিংদীর পৈতৃক বাড়িতে চলে যান এবং সেখানকার স্থানীয় মুক্তিকাম তরুণ ও জনতাকে যুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।
পরে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান ছিনতাই করে তা মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন তিনি।
১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট করাচির মাসরুর বিমান ঘাঁটি থেকে একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নকালে তিনি তা কবজা করেন।
উদ্দেশ্য ছিল বিমানটি মুক্তাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া।
কিন্তু অপর পাইলটের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিমানটি পাকিস্তানের থাট্টা নামক স্থানে বিধ্বস্ত হয়।
প্যারাস্যুট সঙ্গে না থাকায় এই বীর পাইলট ঘটনাস্থলেই শাহাদাত বরণ করেন।
দেহাবশেষ দেশে প্রত্যাবর্তন ও চিরনিদ্রা
শহীদ হওয়ার পর মতিউর রহমানকে পাকিস্তানের করাচিতে সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়েছিল।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশ সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর পবিত্র দেহাবশেষ সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
পরদিন ২৫ জুন অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় তাঁকে ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনঃসংশ্লিষ্ট করা হয়।
স্বাধীন দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন এই বীর সেনানি।
বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি ও জাতির চিরন্তন কৃতজ্ঞতা
মহান মুক্তিযুদ্ধে অতুলনীয় সাহসিকতা, বীরত্ব এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে।
তাঁর এই আত্মত্যাগ কেবল একটি ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁর জীবন ও কর্ম সবসময় অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।
আজকের এই জন্মবার্ষিকীতে আমরা গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই বীরকে, যিনি নিজের প্রাণ বাজি রেখে
দেশের আকাশকে শত্রুমুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর আদর্শ ও দেশপ্রেম চিরকাল আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।
