ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজই মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী।
মুক্তিবার্তা৭১ প্রতিবেদক ঢাকা
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও জনবহুল অঞ্চল মিরপুরে তৈরি পোশাক খাতের কর্মীরা আবারও সড়কে নেমেছেন। তাঁদের মূল দাবি হলো মাসিক ন্যূনতম বেতন ত্রিশ হাজার টাকা নির্ধারণ করা। এই যৌক্তিক আর্থিক চাহিদার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আজ রোববার সকাল থেকেই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা মিরপুর দশ নম্বর চত্বরে অবস্থান নেন। আকস্মিক এই আন্দোলনের কারণে পুরো জনপদে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
টানা দুই দিনের বিক্ষোভ ও সার্বিক পরিস্থিতি
গত শনিবার সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিক অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনরত কর্মীরা মিরপুর দশ, এগারো ও বারো নম্বর এলাকাগুলোর মূল সড়কে অবস্থান নেন। এর ফলে ওই অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। দুপুরের দিকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন শ্রমিকদের একটি অংশ মিরপুর এক নম্বর এলাকার শাহ আলী মাজারের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে কিছু বিপণিবিতান ও পোশাক কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মীদের সঙ্গে শ্রমিকদের ধস্তাধস্তি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এছাড়া কালশী এলাকার একটি কারখানাতেও ভাঙচুরের চেষ্টা চালানো হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
“শ্রমিকদের নায্য দাবিগুলো নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে আন্তরিক আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং শিল্প বাঁচাতে সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।”
প্রশাসনের ভূমিকা ও পুলিশের তৎপরতা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিরপুর থানা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবিলম্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা চলছে এবং বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শ্রমিকেরা তাঁদের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না পাওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়তে নারাজ।
মজুরি বোর্ড গঠনের সরকারি ঘোষণা
শ্রমিকদের এই তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত শনিবার রাতে রাজধানীর বিজয়নগরে অবস্থিত শ্রম ভবনে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী স্পষ্ট ভাষায় জানান যে পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতনকাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যে আজই আনুষ্ঠানিক মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। মন্ত্রী মহোদয় আরও উল্লেখ করেন যে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রীর আহ্বান এবং শিল্প সুরক্ষার তাগিদ
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার শ্রমিক ভাইবোনদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। শ্রমমন্ত্রী বলেন, যেহেতু সরকার নিজেই উদ্যোগ নিয়ে
মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে, সেহেতু রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
কারখানায় ভাঙচুর চালালে বা উৎপাদন বন্ধ রাখলে পরিশেষে দেশের অর্থনীতি এবং শ্রমিকদের নিজেদের স্বার্থই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল পোশাক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও সংকট উত্তরণের পথ
তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাতের ওপর লক্ষাধিক মানুষের জীবনজীবিকা নির্ভরশীল।
তাই শ্রমিকদের নায্য অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি কারখানাগুলোর উৎপাদন সচল রাখাও সমানভাবে জরুরি। সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে
যে দ্রুত নতুন মজুরি বোর্ডের কার্যকারিতা শুরু হলে মিরপুরের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি শান্ত হবে এবং কর্মীরা নিজনিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবেন।
