সরকার গঠনের ৫ মাস পর আজ যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সম্পর্কের নতুন ধারা নির্ধারণের সম্ভাবনা।
সরকার গঠনের পর আজ শরিকদের মুখোমুখি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: চোখ যমুনায়, জমাট বাঁধছে সম্পর্কের নতুন হিসাব
রাজনৈতিক প্রতিবেদক • ঢাকা
নতুন সরকার গঠনের দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস পর অবশেষে যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন জোটের শীর্ষ নেতাদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই বহুল আলোচিত ও সুসংহত রাজনৈতিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর যুগপৎ আন্দোলনে রাজপথে থাকা দলগুলোর সাথে এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক।
বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে পাওয়া তথ্য নিশ্চিত করে দলটির জ্যেষ্ঠ সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, মিত্রদের সম্মান জানাতে ও সৌহার্দ্য পুনর্প্রতিষ্ঠা করতেই প্রধানমন্ত্রী এই নৈশভোজ ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছেন।
বৈঠকের আসল লক্ষ্য: শুধুই কুশল বিনিময় নাকি সম্পর্কের নতুন যাত্রা?
বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মূলত শুভেচ্ছা বিনিময় ও বিগত দিনগুলোর সংগ্রামের সহযোগীদের প্রতি সম্মান জানানোই এই বৈঠকের প্রথম উদ্দেশ্য। নির্বাচনে বিজয়ের পর যে দলগুলো রাজপথে বিএনপির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল এবং যেসব নেতা নির্বাচনের ঠিক পূর্বে নিজেদের রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে ধানের শীষে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে যমুনার টেবিলে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ এক নীতি-নির্ধারক জানান, শরিকদের সাথে সম্পর্কের হৃদ্যতা আরও সুদৃঢ় করা এবং আগামী দিনে সবার মতামত ও ভিত্তিতে দেশকে কীভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলাই প্রধানমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য।
টেবিলে উঠছে একলা চলো নীতি ও আসন বণ্টনের ক্ষোভ
উপরে কুশল বিনিময়ের মোড়ক থাকলেও, এই বৈঠকের নেপথ্যে রয়েছে নানা রাজনৈতিক হিসেব-নিকাশ ও চাপা অসন্তোষ।
বিএনপি ও শরিক দলগুলোর একাধিক প্রথম সারির নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন,
দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে শরিক দলগুলোর আসন বণ্টন ও
সরকার পরিচালনায় অংশগ্রহণ নিয়ে যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে আছে, বৈঠকে তা গুরুত্বের সাথে আলোচনা হতে পারে।
যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত দলগুলোর বড় একটি অংশের অভিযোগ, গত ৫ মাসে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি এক ধরণের
‘একলা চলো নীতি’ অনুসরণ করেছে, যা রাজপথের সহযোদ্ধাদের হতাশ করেছে।
আজকের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের মধ্যদিয়ে শরিক দলগুলো মূলত সরকারি দল হিসেবে বিএনপির প্রকৃত মনোভাব ও রাজনৈতিক কৌশল বোঝার চেষ্টা করবে।
নেতাদের প্রতিক্রিয়া: নতুন সম্পর্কের সমীকরণ?
১. বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি
বৈঠক প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন:
“প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে আজকের বৈঠকে আমরা সরাসরি সরকার এবং বিএনপির মূল দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবনের চেষ্টা করব। সরকার গঠনের পর রাজপথের শরিকদের সাথে তারা কি অতীতের মতো সম্পর্ক বজায় রাখবে, নাকি এটি সম্পর্কের শেষ ইতি—তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি।”
২. ভাসানী জনশক্তি পার্টি
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু জানান, তাঁরা শুধুই সৌজন্য সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। তিনি বলেন:
“আমাদের মূল ফোকাস থাকবে ‘৩১ দফা’ রূপরেখা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে। পাশাপাশি একটি অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের বিষয়েও আমরা বিএনপির চেয়ারম্যানের সাথে স্পষ্ট কথা বলব।”
ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা ও জোটের গতিপথ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের এই বৈঠকটি কেবল একটি নৈশভোজ বা সাধারণ কুশল বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
বরং এটি সরকার পরিচালনায় মিত্রদের অংশগ্রহণ, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে যেকোনো রাজপথের ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে।
আজ রাতের এই উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় শেষে যমুনা থেকে শরিক নেতারা কী বার্তা নিয়ে ফেরেন—
এখন সেদিকেই অপলক তাকিয়ে আছে দেশের সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গন।
