প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শন, পিআর ক্যাম্পেইনের বিতর্ক, চিকিৎসকের ধূমপান কাণ্ড এবং স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব সংকট
স্বাস্থ্য খাতের নাজুক পরিস্থিতি ও আকস্মিক পরিদর্শন
স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা আজ অত্যন্ত করুণ। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবা ভেঙে পড়েছে। গরিব মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পায় না। ওষুধের অভাবে হাসপাতালগুলো খাঁ খাঁ করে। এরই মধ্যে সরকারের তরফ থেকে পরিদর্শনের হিড়িক পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি শিশু হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এই পরিদর্শন নিয়ে নানা রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকরা একে নিছক পিআর ক্যাম্পেইন হিসেবে দেখছেন। লন্ডনের বাসে চড়ার স্টাইলের সাথে এর তুলনা চলছে। পূর্বনির্ধারিত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই সফর আয়োজন করা হয়েছিল।
পূর্বপ্রস্তুতি ও সাজানো নাটকের বাস্তবতা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আগে থেকেই সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। ওয়ার্ডের বেডে নতুন মশারি টানানো হয়েছিল তড়িঘড়ি করে। ফ্লোরে থাকা অসুস্থ রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছিল কড়াকড়িভাবে। গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আগেই অবস্থান নেন। এত প্রস্তুতির পর পরিদর্শনের নাটক কতটুকু বাস্তবসম্মত? সরকার প্রধানের আকস্মিক পরিদর্শনের আসল রূপ উন্মোচিত। হাসপাতালের ভেতর চিকিৎসকের সিগারেট খাওয়ার ঘটনা নিয়ে তোলপাড়। কক্ষের ভেতর বসে ধূমপান করা নিঃসন্দেহে বড় অপরাধ। কিন্তু এর জন্য কি প্রধানমন্ত্রীকে সশরীরে হাজির হতে হবে?
প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা
হাসপাতালের পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তবে কী কাজ করছে? প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড কেন এত দুর্বল হয়ে পড়ল? হাজার হাজার শিশু আজ হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। ওষুধের অভাবে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো প্রায় বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসা উপকরণের অভাবে অপারেশন থিয়েটারগুলো তালাবদ্ধ থাকে। সেসব মৌলিক সংকট সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। অথচ একটি সিগারেটের ঘটনাকে বড় করে দেখানো হলো। এটি সম্পূর্ণভাবে জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল মাত্র।
তারেকের পিআর টিম এই ধরনের নাটক নিয়মিত উপহার দিচ্ছে। জনসাধারণের এখন এসব সাজানো নাটক আর বিশ্বাস হয় না।
জনদুর্ভোগ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার দেউলিয়াপনা
স্বাস্থ্য খাতের এই দেউলিয়াপনা আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিশু মৃত্যুর মিছিল থামানোর কোনো গরজ কারো নেই। করিম সাহেব কিংবা রহিমা বিবিরা সঠিক চিকিৎসা পান না।
জরুরি বিভাগে গেলে ওষুধ মেলে না বাইরে থেকে কিনতে হয়। ডাক্তাররা নিজেদের কক্ষে বসে আড্ডা দেন ও ধূমপান করেন।
এই অনিয়মগুলো কি এতদিন কারও চোখে পড়েনি? রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে তদারকি করা ভালো উদ্যোগ। তাই বলে নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা ঢাকতে এমন নাটক অনভিপ্রেত।
জনগণ চায় সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার। লোক দেখানো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে কখনো সিস্টেম বদলায় না।
দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেট ও বাস্তব চিত্র
দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে টিকে আছে। টেন্ডারবাজি আর কমিশন বাণিজ্যে স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস হয়ে গেছে। কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হলেও তা নষ্ট হয়।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দামি মেশিনগুলো লোহাচুর হয়ে পড়ে থাকে। গরিব মানুষ বাধ্য হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে প্রাইভেটে চিকিৎসা নেয়।
সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা নিজেদের চেম্বার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এসব কঠিন বাস্তব সত্য নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না।
পিআর ক্যাম্পেইনের আলোয় সব অন্ধত্ব ঢাকা পড়ে যায়। মিডিয়ায় বড় বড় শিরোনাম করে বাহবা কুড়ানোই মূল লক্ষ্য।
দেশের সাধারণ মানুষ এসব প্রতারণা খুব ভালোভাবেই বোঝে।
স্থায়ী সংস্কারের দাবি
আগামী দিনে এই দেউলিয়া রাজনীতির উপযুক্ত জবাব মিলবে। স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
প্রচারসর্বস্ব রাজনীতি ও পিআর ক্যাম্পেইন কোনো সমাধান নয়। জনসাধারণ এখন কাগজের উন্নয়নের খতিয়ান দেখতে চায় না। তারা হাসপাতালের বেডে প্রকৃত চিকিৎসা সেবা পেতে চায়। সরকারের উচিত লোক দেখানো নাটক অবিলম্বে বন্ধ করা।
স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত সংস্কারে অবিলম্বে মনোনিবেশ করা জরুরি। অন্যথায় জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটবে অচিরেই।
সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমেই কেবল স্বাস্থ্য খাতের মুক্তি সম্ভব। জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
