প্রশাসনিক সচিব কমিটির সভায় পুলিশে ৪ হাজার এসআই ও ১০ হাজার কনস্টেবল সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ বিসিএসে নেওয়া হবে এএসপি।
প্রশাসনিক সচিব কমিটির বৈঠকে বিশাল জনবল নিয়োগের অনুমোদন
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন এবং দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে একসঙ্গে চার হাজার উপপরিদর্শক (এসআই) এবং দশ হাজার কনস্টেবল পদে নতুন জনবল নিয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে চৌদ্দটি মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তার ঘাটতি মেটাতে সরকারের এই পদক্ষেপে পুলিশ প্রশাসনে এক বিশাল পরিবর্তন আসতে চলেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে বলে জানা গেছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার কঠোর টার্গেট হাতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ প্রবিধানে পরিবর্তন ও সরাসরি এসআই নিয়োগ
প্রচলিত পুলিশ প্রবিধান বা পিআরবি অনুযায়ী এত দিন এসআই পদের ঠিক অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ পূরণ করা হতো বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে। বাকি অর্ধেক শূন্য পদে সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন জনবল নেওয়া হতো। তবে বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ও বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সরকার প্রবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনেছে।
সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, এবার কোনো ধরনের বিভাগীয় পদোন্নতি ছাড়াই সম্পূর্ণ চার হাজার এসআই পদেই সরাসরি নতুন নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে। শুধুমাত্র এই একবারের জন্যই পুরো কোটা সরাসরি নিয়োগের আওতায় আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা সাব-ইনস্পেক্টর ও সার্জেন্টদের মধ্যে একধরনের হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক নিয়োগ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে পুলিশ বাহিনীতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সদস্যের বিশাল নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছিল। সেই সময়কার রাজনৈতিক পটভূমি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বহু প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যায়।
বর্তমান প্রশাসনের নীতি নির্ধারকরা অনুভব করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি ঘটাতে
এবং গোয়েন্দা তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে।
মূলত এই শূন্যতা পূরণ করতেই ত্বরিত গতিতে নতুন নিয়োগের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৪০০ থেকে ৫০০০ এএসপি নিয়োগ
উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল পদের পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর উচ্চপর্যায়েও বড় ধরনের রদবদল ও নতুন ক্যাডার সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সহকারী পুলিশ সুপার বা এএসপি পদে নিয়োগের উদ্দেশ্যে খুব শীঘ্রই একটি বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা আয়োজন করা হতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, বিশেষ এই ৫২তম বিসিএসের মাধ্যমে চার থেকে পাঁচশ নতুন এএসপি সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে।
নিয়োগের পর দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের পরিবর্তে এসব নবীন কর্মকর্তাদের মৌলিক বা বনিয়াদি প্রশিক্ষণের মেয়াদ কিছুটা সংক্ষিপ্ত করার কথাও ভাবছে সংশ্লিষ্ট মহল।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো দ্রুত মাঠপর্যায়ে দক্ষ ও চৌকস নেতৃত্বের জোগান নিশ্চিত করা,
যাতে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব হয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও গোয়েন্দা যাচাই
বিগত দিনের বিভিন্ন বিতর্কিত নিয়োগ থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকার এবার অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
নতুন করে নিয়োগ পেতে যাওয়া প্রতিটি প্রার্থীর ক্ষেত্রে কঠোর গোয়েন্দা যাচাই-বাছাই বা ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হবে।
কোনো ধরনের রাজনৈতিক সুপারিশ বা অনিয়ম যেন এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে জানান যে,
অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট অনুমোদনের পরেই এই পদগুলো সৃজন করা হয়েছে।
পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশপ্রেমিক ও দক্ষ তরুণদের পুলিশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করাই বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
