নীতিমালা ছাড়াই ডিএসসিসি কর্মকর্তাদের মাসে ৬০০ লিটার তেল বরাদ্দ ও অ্যাম্বুলেন্সে যাতায়াতের চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখুন বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
মুক্তিবার্তা৭১ প্রতিবেদক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসনিক কার্যক্রমে জ্বালানি তেল ব্যবহার নিয়ে গুরুতর অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সংস্থাটির শীর্ষ থেকে মাঝারি স্তরের ৭৬ জন কর্মকর্তা নিজেদের ইচ্ছেমতো তেল খরচ করছেন। বরাদ্দকৃত এই জ্বালানির সঠিক ব্যবহার না হয়ে নানা উপায়ে অপচয় ঘটছে। এমনকি রোগী পরিবহনের অতি জরুরি অ্যাম্বুলেন্সও ব্যক্তিগত যাতায়াতে ব্যবহারের নজির মিলেছে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলা এই সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানি বরাদ্দ
রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রাধিকারপ্রাপ্ত গাড়িতে সর্বোচ্চ ২০০ লিটার এবং সচিব পদমর্যাদার জন্য সর্বোচ্চ ২৫০ লিটার জ্বালানি দেওয়ার বিধান রয়েছে। অথচ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণ্ডির ভেতরে কর্মকর্তাদের জন্য এই নিয়ম কোনোকালেই কার্যকর ছিল না। এখানে প্রতিটি গাড়ির বিপরীতে মাসে ৪০০ থেকে ৬০০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি ছাড় করা হচ্ছে।
যেকোনো সরকারি সংস্থায় নিজস্ব নীতিমালা থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ডিএসসিসির ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখা যায়। বছরের পর বছর ধরে চলা এই পুরোনো ও অযৌক্তিক রীতি পরিবর্তনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারাও এই বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট কোনো ভিত্তি দেখাতে পারেননি। পুরোনো ফাইলের অজুহাত দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এই হরিলুট চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
১১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে মাসে ৬০০ লিটার তেল!
অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বুঝতে ডিএসসিসির কিছু নির্দিষ্ট কর্মকর্তার গাড়ির জ্বালানি খরচের হিসাব দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। ধানমন্ডির বাসা থেকে নগর ভবনে যাতায়াত করতে প্রশাসকের একান্ত সচিবের দৈনিক দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। এই সামান্য পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য তাঁর গাড়িতে মাসিক বরাদ্দের পরিমাণ রাখা হয়েছে ৬০০ লিটার।
হিসাব কষে দেখা গেছে, এই পরিমাণ তেলে গাড়িটি প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার চলার কথা। অথচ বাস্তবে দৈনিক এর সিকিভাগ পথও অতিক্রম করা হয় না। দিনের পর দিন এই অতিরিক্ত তেল উত্তোলনের পেছনে অন্য কোনো অবৈধ বাণিজ্য কাজ করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চালকদের একটি বড় অংশ অতিরিক্ত এই জ্বালানি বাইরে বিক্রি করে ব্যক্তিগত পকেট ভারী করছেন বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
———————————————————————
কর্মকর্তার পদ | বর্তমান মাসিক বরাদ্দ | সরকারি নিয়ম সীমা
———————————————————————
একান্ত সচিব | ৬০০ লিটার অকটেন | ২০০ লিটার
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা | ৯৩০ লিটার (দুটি গাড়ি) | নির্ধারিত সীমা অতিক্রম
প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা | ৫১৯ লিটার ডিজেল | ২৫০ লিটার
সিস্টেম অ্যানালিস্ট | ৪০০ লিটার ডিজেল | ২০০ লিটার
প্রধান নির্বাহীর বহরে ডাবল গাড়ি ও বাড়তি বিলাসিতা
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার জন্য নিয়ম ভেঙে দুটি গাড়ি বরাদ্দ রাখার পুরোনো ঐতিহ্য এখনো বহাল রাখা হয়েছে। একটি মাত্র গাড়ি দাপ্তরিক কাজের জন্য যথেষ্ট হলেও অতিরিক্ত আরেকটি গাড়ি সবসময় তাঁর অনুকূলে রাখা হয়। এই দুটি গাড়ির পেছনে প্রতি মাসে প্রায় ৯৩০ লিটার জ্বালানি খরচ করা হয়।
শুধু জ্বালানি বাবদই এই জোড়া গাড়ির পেছনে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। চালকদের বেতন এবং গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এর বাইরে রয়েছে। অতীতে এই বিষয়ে প্রশ্ন উঠলেও এবং নতুন কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও অবস্থার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি। উত্তর সিটি করপোরেশনের দোহাই দিয়ে এই অপ্রয়োজনীয় গাড়ি বহর টিকিয়ে রাখার জোরালো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা।
দাপ্তরিক কাজে অ্যাম্বুলেন্স, ব্যক্তিগত যাতায়াতে ব্যবহার
জরুরি চিকিৎসাসেবা ও রোগী পরিবহনের জন্য নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স কীভাবে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত যাতায়াতের বাহন হয়, তা এক বড় প্রশ্ন। ডিএসসিসির অধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও মাতৃসদনের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা এই গুরুতর অনিয়মের সাথে সরাসরি জড়িত। নথিপত্রে এই গাড়িগুলোকে দাপ্তরিক কাজের কথা বলা হলেও বাস্তবে এগুলো কর্মকর্তাদের বাসা থেকে অফিস আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।
ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালের পরিচালকদের পাশাপাশি মাতৃসদনের কর্তারাও এই সুবিধা নিচ্ছেন।
রোগী যখন অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে ধুঁকছে, তখন চিকিৎসালয়ের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চড়ে কর্মকর্তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও আরামদায়ক যাতায়াত উপভোগ করছেন।
তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে এক মাসেই হাজার লিটার জ্বালানি পোড়ানোর ঘটনা প্রমাণ করে সেবার মানোন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিগত ভোগই এখানে প্রধান হয়ে উঠেছে।
চালক সিন্ডিকেটের হাত ধরে চলে লাখ টাকার বাণিজ্য
জ্বালানি বরাদ্দের এই অনিয়মের সাথে গ্যারেজ ও পরিবহন শাখার একটি প্রভাবশালী চক্র সরাসরি জড়িত রয়েছে।
কর্মকর্তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল বরাদ্দ পেলেও তার পুরোটা গাড়ির ট্যাংকে ঢোকে না।
চালকদের একটি অংশ এই তেল নিয়মবহির্ভূতভাবে বাইরে খোলা বাজারে বিক্রি করে নগদ টাকা পকেটে তোলেন।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিষয়টি পুরোপুরি অবগত থাকলেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন।
এই অনিয়মের লাগাম টানতে গেলেই চালকদের পক্ষ থেকে তীব্র অসন্তোষ ও কর্মবিরতির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এই ভয়ে কেউ আর তেল চুরি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না।
ফলে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় তহবিল প্রতি বছর এভাবেই তছরুপ হয়ে যাচ্ছে।
কোটি কোটি টাকার অপচয় ও সংস্কারের সুবর্ণ সুযোগ
দক্ষিণ সিটির ৭৬ জন কর্মকর্তার প্রত্যেকের গাড়িতে যদি নিয়মমাফিক মাসে ২৫০ লিটার করে তেল বরাদ্দ দেওয়া হয়,
তবে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।
বর্তমান বাজারদরে হিসেব করলে অতিরিক্ত বরাদ্দের কারণে প্রতি বছর প্রায় আড়াই কোটি টাকা গায়ের জোরে খরচ করা হচ্ছে।
সামান্য কিছু মানুষের বিলাসী জীবনযাত্রার জোগান দিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে।
অথচ এই টাকা শহরের রাস্তাঘাট মেরামত, মশা নিধন কিংবা জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ব্যবহার করা গেলে নগরবাসী উপকৃত হতো।
আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে বরাদ্দ কমানোর পাশাপাশি কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করার বিকল্প কিছু নেই।
সুশাসনের অনুপস্থিতি ও টিআইবির কঠোর হুশিয়ারি
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নগ্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, জনগণের অর্থে চলা সংস্থায় কোনো ধরনের বেআইনি সুবিধা নেওয়ার অবকাশ নেই।
যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই তেল হরিলুট করছেন, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও জবাবদিহির অভাব না থাকলে এ ধরনের অন্যায় কর্মকাণ্ড আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ডিএসসিসির বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম বিষয়টিতে নজর দেওয়ার কথা বললেও কাজের কাজ কতটা হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে এই জ্বালানি বিলাসিতা চিরতরে বন্ধ করা না হলে সংস্থার মূল সেবা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়বে।
