জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আ.লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্য তিনজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড।
মুক্তিবার্তা৭১ প্রতিবেদক অনলাইন ডেস্ক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। একই বিচারিক রায়ে আরও তিন শীর্ষস্থানীয় নেতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল এই আদেশ ঘোষণা করেন। আদালতের এই বেঞ্চের নেতৃত্ব দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। প্যানেলের অপর দুই সম্মানিত সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বিচার প্রক্রিয়া শেষে ট্রাইব্যুনাল এই কঠোর সিদ্ধান্ত জানান।
যাদের বিরুদ্ধে এলো আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা
প্রধান অভিযুক্ত মাহবুব উল আলম হানিফ ছাড়াও এই মামলায় আরও তিনজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দণ্ডিত হয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রাপ্ত এই তিনজন হলেন—কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। রায় ঘোষণার সময় চার আসামির কেউই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। আইনগতভাবে তারা সবাই পলাতক হিসেবে চিহ্নিত রয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব পালন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তাকে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যপ্রমাণের পর আদালত তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় এই গুরুদণ্ড দেন।
রায়ের বিবরণ ও আইনি ধারা
আদালতের রায়ে মাহবুব উল আলম হানিফকে একটি নির্দিষ্ট অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাকে অন্য দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে, সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী এবং আতাউর রহমান আতাকে একটি অভিযোগে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাদের অপর দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। আরেকটি পৃথক অভিযোগে চারজন আসামির সবার জন্যই যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ বহাল রাখা হয়েছে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিপূরণের ঐতিহাসিক নির্দেশনা
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত কড়া আর্থিক ও সম্পত্তি সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রদান করেছেন। সাজাপ্রাপ্ত সকল আসামির সমস্ত স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক অংশ তাৎক্ষণিকভাবে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বাজেয়াপ্তকৃত সম্পত্তি বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা সরাসরি জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা সরকারের অন্য কোনো অনুমোদিত বিধিবদ্ধ সংস্থার তহবিলে জমা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তীতে এই অর্থ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত বীরদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে বন্টন করা হবে।
কুষ্টিয়ায় সংঘটিত নৃশংসতা ও প্রসিকিউশনের অভিযোগসমূহ
প্রসিকিউশন দপ্তরের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে কুষ্টিয়া অঞ্চলে ছাত্র-জনতার ওপর ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। এই নৃশংস হামলায় ছয়জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। মূলত এই হত্যাকাণ্ডসহ মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল আসামিদের বিরুদ্ধে।
তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয় যে, কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনের নেপথ্যে সরাসরি উসকানি এবং নির্দেশদাতা হিসেবে কাজ করেছিলেন এই নেতারা।
প্রথম অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই এবং ৩ আগস্ট তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের
সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেন হানিফ। সেখানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের পূর্ণ সমর্থন জানান তিনি।
এছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সভায় আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি’
হিসেবে উল্লেখ করে তাদের ওপর দমনপীড়ন চালানোর ক্ষেত্রে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
তৎকালীন সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার
এবং আকাশপথ থেকে ড্রোন কিংবা হেলিকপ্টারের মাধ্যমে অবস্থান চিহ্নিত করে হামলার পরিকল্পনাতেও তার সায় ছিল।
দ্বিতীয় অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক।
হানিফের সরাসরি নেতৃত্বে সেখানে সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমান আতাসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ওই বৈঠকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বলে আখ্যায়িত করা হয়।
পাশাপাশি কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন কঠোর হাতে দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ আসে।
তৃতীয় ও চূড়ান্ত অভিযোগটি ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘটিত ভয়াবহ রক্তপাত নিয়ে।
সেদিন কুষ্টিয়ার রাজপথে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করা হয়। শহীদ হওয়া এই নাগরিকরা হলেন—শ্রমিক
আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
দিনভর চলা ওই তাণ্ডবের পেছনে এই চার নেতার প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও পরিকল্পনা কাজ করেছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
